TjT

করনা প্রতিরোধে হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার মেনে চলুন। অপরিষ্কার হাত দিয়ে চোখ, নাক ও মুখ স্পর্শ্ করা থেকে বিরত থাকুন। অ্যালকোহল যুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার হাতের তালুতে নিয়ে ( 20 সেকেন্ড ) ভাল করে পরিষ্কার করুন। ব্যবহৃত টিস্যু ঢাকনা যুক্ত ডাস্টবিনে ফেলুন। পরিচিত বা অপরিচিত ব্যক্তির সাথে হাত মেলানো বা আলিঙ্গন করা থেকে বিরত থাকুন। আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকুন।

মুঠোফোন

হাউসী বানুদের সংসারে থৈ থৈ অভাব। অভাব ওদের ঘর বাড়িতে সমুদ্রের ঢেউ এর মতো আছড়ে পড়ে। বকুলের ঘ্রাণ হয়ে উছলে পড়ে ছেড়া কাঁথায় পরনের কাপড়ে।


বালুকা বেলায় দাঁড়ালে যেমন সমুদ্রের কুল কিনারা দেখা যায় না তেমনি হাউসীও সংসারের কোথায়ও সচ্ছলতার ছোঁয়া দেখতে পায় না। দুপায়ের বুড়ো আঙ্গুলে ভর করে দাঁড়িয়ে মাথা উচু করে ভবিষ্যত দেখতে চায়, সেখানেও থৈ থৈ করছে অনন্ত অভাব। সূর্য কিরণ যেমন গভীর সমুদ্রে ঝিলিক তোলে, তেমনি দফায় দফায় দ্রব্য মূল্যের উদ্ধগতি হাউসীর সংসারের অভাবকে উসকে দেয় অবিরত।


এই যে সামনে পেছনে বাম ডানে অভাব তবুও হাউসীর মনে এখন অনেক আনন্দ, অনেক খুশী। ওর অনাবিল খুশীর একমাত্র কারণ ওর স্বামী হাসমত আলীর সদ্যকেনা মোবাইল ফোনটা! এই ছোট্ট যন্ত্রটা ওদের অভাবে অভ্যস্ত জীবনে একটু খুশী এনে দিয়েছে, এটা কম কথা নয়! স্বামীর সদ্যকেনা এই যন্ত্রটি হাতে নিয়ে উল্টে পাল্টে দেখছে এ যেন সাত রাজার ধন ওদের এই পর্ণ কুটিরে এসেছে। হাউসী এই যন্ত্র দিয়ে ওর মায়ের সাথে কথা বলে। মনে হয়েছে এই যন্ত্রটার মধ্যদিয়ে পলকেই মা ওর অন্তরের গভীর প্রবেশ করে। ওদের আট বছরের মেয়ে শাবজানও খুব সুন্দর ভাবে 'হ্যালু' 'নানী অহন কি করতাছো' শাবজানের চোখের দিকে তাকালে মনে হয় বামন হাটা গ্রামের উঠোনে বসা হত দরিদ্র নানী ওর সামনেই বসে আছে।


হাসমতের মোবাইল নানা কায়দা কানুন আছে, গান শোনা যায়, নায়ক নায়িকার ছবি দেখা যায়, যখন তখন বিভিন্ন জন্তু জানোয়ারের ডাক শোনা যায়, নারীকণ্ঠের খিল খিল হাসি, সদ্যজাত শিশুর কান্না শোনা যায়। নিজেদের ছবিও তোলা যায়, ঘাড় কাত করে শাবজান হাসছে সেই ছবিও হাসমতের মোবাইল সেটে আছে। একরাতে হাউসীকে জোর করে চোখে কাজল পরিয়ে মাথায় ঘোমটা তুলে দিয়ে একটা ছবি তুলে দিয়েছে। বন্ধুর কাছ থেকে শার্টপ্যান্ট সানগ্লাস চেয়ে এনে পরা একটা ছবি আছে হাসমতের। মোবাইল সেট হাতে নিলেই সেই ছবিটা চোখে পড়বেই।


প্রতি রাতেই রান্না খাওয়ার পর মোবাইলটা হাতে নিয়ে হাউসী একবার সামনে বসা হাসমতের মুখে আরেকবার ছবির হাসমতের দিকে তাকায়, বুঝতে পারে না কোন মুখটা বেশি প্রিয় তার।

হাসমতের মোবাইল ফোন দিয়ে যখন তখন কথা বলা হাউসীর হয়ে উঠেনা, ওর যাপিত জীবনের সময় বাতাসের সাথে বাঁধা। সূর্য জাগার আগে জেগে উঠতে হয় হাউসীকে।


ওদের প্রাতক্রিয়া সম্পাদনের জায়গা হল নীল পলিথিন আর কুড়িয়ে পাওয়া ব্যানার দিয়ে ঘেরা স্থান। আয়েসী আমেজে সেখানে যাবার ব্যবস্থা নেই। পলকেই সেরে নেয় যাবতীয় মহান কর্মকান্ড।


ঘরে ঢুকে দেখতে পায় শাবজান ও হাসমত বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। হাসমত গভীর রাত জেগে কথা বলেছে তাই রাতের ঘুম টুকু পোষাতে বেলা নটা দশটা তো হবেই। একটু পরে শাবজানও জেগে দেখতে পারে তার বাবা গভীর ঘুমের অতলে।


হাউসী আঁচলে মুখ মুছতে মুছতে স্বামী সন্তানের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকায়। আধো - অন্ধকারে তার কাজের তাড়নায় বেশীক্ষণ তাকাতে পারে না। দ্রুত হাত চালিয়ে তাক থেকে হাতড়ে চিরুনী নামিয়ে ঘস ঘস করে চিরুনী চালায় সারাদিনের চিরুনীর স্পশ বঞ্চিত চুলে। পরনের শাড়ীটা খুলে শক্ত হাতে ঝাড়া দিয়ে গুছিয়ে পরেই ঘরের কোনে পাস্তার পাতিলের দিকে তাকায়।


হাউসী যখন দরজা খুলে বাইরে বের হয় তখনই সূর্য পৃথিবীতে আসে! দরজাটা বিশেষ কায়দায় বন্ধ করতে করতে হিসাব মেলায় ময়লা কাথায় ঢাকা স্বামী সন্তান ছাড়া চোরের নেবার আর কিছুই নেই। এখন অবশ্য হাসমতের মোবাইল সেট আছে। সেটাও হাসমতের বালিশের তলায়।


চারটা বাড়ির ছুটা কাজ সারতে সারতে বেলা গড়িয়ে যায়। এই বেলা যে বাড়িতে কাজ করে সেখানে ওর কাপড় কাঁচার ডিউটি। মালকিনের কাপড় কাঁচতে গিয়ে হাসমত ও শাবজানের কাপড় ও কেঁচে নিজের গোসল সেরে ফেলে।


ওদের বস্তিতে পানির খুব অভাব। রাতে ফিরে তিন কলসী পানি ভাগে পায়, তাতে শাবজার্নের গোসল হাসমতের গোসল এবং রান্না খাওয়া চলে কোন মতে।


এ বাড়ির খালাম্মার দুপুরে খাবার দেবার কথা না থাকলে ও হাড়িতে লেগে থাকা ভাতগুলো তরকারীর পাতিল পুছে খেয়ে নেয়। খালাম্মা প্রতিদিনই সন্দেহের তীর ছুঁড়ে হাউসীর দিকে তার সর্তক দৃষ্টি এড়িয়ে হাউসী বুঝি কটা চাল বেশিই ফেলে দিয়েছে গরম পানিতে। নইলে হাউসীর পাতে প্রতিদিন ভাত কেন? চোখের পানি মুছতে মুছতে গলায় আঁটকে যাওয়া ভাতটুকু গিলতে গিলতে ভাবে, এইটুকু ভাত আর পাতিলে লেগে থাকা ঝোল যদি হাউসী কেঁচে বের না করতো তবে তা মাজুনীতে লেগে পানিতে ধুয়ে চলে যেত গহবরে। এইটুকু ভাত খেতেই এতো গ্লানি।

পাতিল পোছা ভাতটুকু খেতে খেতেই ওর শরীরটার শক্তি নি; শেষ হয়ে গেলেও ভেতর তাড়াদেয় সন্ধ্যার বাড়ির কাজ। নিজের ঘরে গিয়ে আবার ঠিক সময়ে ফিরতে পারবে না পথের দূরত্বে কারনে। আঁচল বিছিয়ে খালাম্মার রান্নাঘরেই শুয়ে পড়ে।


বিশ্রাম সেরে উঠতেই খালাম্মার ভঙ্গি ওকে বুঝিয়ে দেয় মেঝেতে ঘুমানোরও একটা মূল্য আছে। সেটা চা বানিয়েই শোধ করতে হবে। হাউসী ঝটপট চা তৈরি করেই ছোটে সন্ধ্যার বাসায়।


এ বাসার আপা অফিস শেষে ছেলে মেয়ে দু'টিকে কোচিং থেকে নিয়ে ফেরে। এই আপা খুবই নরম মনের, পাতিল থেকে চা কেতলীতে ঢালতে গিয়ে তলানীতে রেখে যায় হাউসীর জন্য। নাশতারও ভাগ দেয় হাউসীকে। হাউসী নাশতাটুকু তুলে রাখে দুপুরে আধপেটা পান্তা খাওয়া শাবজানের জন্য।


আপার রান্নার যোগার দিয়ে ঘর দোর পরিস্কার করতে থাকে, ততক্ষণে আপা রান্না চড়িয়ে ফেলে। আপার রান্নার মধ্য পর্যায়ে ফেরে আপার স্বামী। তাকে হাউসী ভাইজান বলে ডাকে।


ভাইজান দেখতে খুব সুন্দর। একটা সার্ট ভাইজান দুদিন পরে না, সৌখিন হলেও খুবই কাজ পাগল। বাসায় ফিরেও কাজ থেকে ফুসরত মেলেনা তার। একবার মোবাইল ফোন বাজে সেটাতে কথা শেষ করতে না করতেই ল্যান্ড ফোন বাজে।


হাউসী কাজের ফাঁকে দেখে কাপের চা কাপেই পড়ে থাকে, পিরিচের নাশতা পিরিচেই পড়ে থাকে, ভাইজানের কথা শেষ হয় না। হাসমতের মুখটা ভেসে উঠে ভাইজানের মুখে। ভাইজান কত দরকারী কথা সারে আর হাসমত...


হাসমতে প্রতিদিনের রিক্সা, চালানোর খুচরা টাকা ফুরিয়া যায় ডাল তরকারী কিনতেই। তাই হাউসীর বাসাবাড়ির বেতনের টাকা দিয়ে ঘর ভাড়া আর চালের দাম পরিশোধ করে। হাসমত রাতে রিক্সা গ্যারেজে জমা দিয়ে আসার সময় ডাল তরকারি কিনে আনার সময় আজকাল মোবাইলেও পেট ভরিয়ে আনে। এতে সংসার খরচে বেশ টান পড়ে?


এখন হাসমতের রোজগারও কমে গেছে রাত জেগে কথা বলে তাই ভোরে উঠে রিক্সা ধরতে পারে না। রোজগার কমে যাওয়াতে হাসমতের ভ্রুক্ষেপ নাই রাতজেগে কথা বলতে পারছে এটাই ওর আনন্দ।


আগে ভর পেট ভাত খেত এখন আধপেটা খেয়েও হাউসীর আনন্দ, তার স্বামী কত রকমের মানুষের সাথে কত ভাবেই না কথা বলে।


ইদানিং গভীর রাতে একজন মেয়ে ফোন করে। প্রথম দিকে ব্যাপারটা নিয়ে হাসাহাসি করতো হাউসী। এখন ফোনে রিং বাজার সাথে সাথেই হাউসীর বুকে সুক্ষ্ম একটা পিন ফোটে। ঘুম বাদ দিয়ে পর পুরুষের সাথে কিসের এত রসের কথা। যে রসের আঠার সাথে আটকে হাসমতও জেগে থাকে। ঘুম না হয় থাক, মেয়েটা এত টাকাই বা পায় কোথায়, সেটাই মহা রহস্য। হাসমতই রহস্য ভেদ করে দেয়। গভীর রাতে কথা বলতে অনেক কম টাকা লাগে।


হাসমত নিজেকে অবিবাহিত পরিচয়ে কথা বলে। হাসমতের পাশে শুয়ে নিজেকে অস্পশা মনে হয় হাউসীর নিজেরও। ওর বুকের ভেতর জেগে উঠে দিগন্ত জোড়া ফাগুনের হলুদ সরষে ক্ষেত তার মাঝে বিকেলের মরে যাওয়া রোদে সবুজশাড়ী পরে দাঁড়িয়ে আছে হাউসী।


মেয়েটার সাথে কতা শেষ করেই মুরগীর বাচ্চার মত হাউসীকে পাকড়াও করে বাজপাখীর থাবায়। হাউসীর শরীরের আনাচে কানাচে বিচরণ করে হাসমতের হ্যাণ্ডেল ধরা হাত। হাউসীর ভেতরও কাজ করে নতুন আমেজ। প্রেমে থর থর করে উঠে। রোমাঞ্চে আর্দ্র হয় ওর লুকানো নদী। সক্রিয় হয় হাসমত। যৌথ উদ্দ্যোগেই প্রেম-কাম পর্ব সমাধান হয়। হাউসীর ঈর্ষা নিমিষেই প্রেম হয়ে গলে পড়ে।


একদিন সময়ের চেয়ে দেরীতেই ঘরে ফেরে হাউসী। তখনও বাজার হাতে হাসমতের দেখা নেই। হাসমতের ফেরার প্রহর গুনতে থাকে কন্যাসহ হাউসী। প্রতীক্ষার প্রহর দুঃচিন্তায় দূর্বিসহ হয়ে ওঠে। শাবজান কাঁদতে শুরু করে।


বস্তির একটা সুবিধা আছে যা ফ্ল্যুট বাড়িতে নেই। বস্তির সবাই সবার বিপদে এগিয়ে আসে। ওর লাগোয়া ঘরের নাসিমন ভাবী আর তার স্বামী সি.এন.জি চালক কাশেম ভাই এগিয়ে আসে। নাসিমন ভাবী এক বাটি তরকারী এনে শাবজানকে ভাত খাওয়ায়। কাশেম ভাই হাসমতের নম্বরে যতবারই রিং বাজায় ততবারই 'দুঃখিত এই মূর্ছতে মোবাইলটিতে সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।'


দুঃচিন্তা দূর্ভাবনায় নির্ঘুম রাতটা কাটে হাউসীর। সকালেই যায় গ্যারেজ মালিকের কাছে। রমজান মহাজনই খুলে বলে সব।

কাইল সকালে নয়া কাপড় পিন্দা আমার কাছে আইছিল বিদায় লইতে।


বিদাই কিয়ের বিদাই।


এই হানে বুইলে তারে মানায় না, এই কামও বুইলে তার না।


কই গেল মানুষটা, সন্ন্যাস নিল নাকি, আপনেরে কইছে কিছু।


হৃদপিন্ডের তার ছিড়ে যায় হাউসীর।


আমারে তো কিছু কয় নাই, মফিজরে কইছে নতুন কইরা জেবন শুরু করব হে।


: তক্ষনাৎ রমজান মহাজনের কথার মাথামন্ডু কিছুই বুঝতে না পারলেও এটুকু পরিস্কার বুঝতে পারছে হাসমতকে জোর করে কেউ আটকে রেখে মেরে কেটে রিক্সা ছিনিয়ে নেয় নাই। যে খানেই গিয়ে থাক হাসমতের ইচ্ছাতে গেছে। স্বস্থির নিশ্বাসটা সুস্থির ভাবে পড়তে পড়তে মনে হয় একটা নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখাতো হাসমত হাউসীকে। সেই স্বপ্নের মোহে হাসমতের হাত ধরে গ্রাম থেকে শহরে এসেছিল হাউসী। হাউসীর সেই স্বপ্নতো বাসাবাড়ীর বাসন মাজতে মাজতে কবেই শেষ হয়ে গেছে। তবুও হাসমতের স্বপ্নটা মরে নাই, এটাই ভালো, ও হয়তো একাই গেছে স্বপ্নটা শুরু করতে কোন এক সময় হয়তো চমকে দেবে হাউসীকে।


রমজান মহাজনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রাস্তায় নেমে একটু থমকে দাঁড়ায়, ওদের ভবিষ্যতের জন্যই হাসমতের নতুন জীবন। এর পর ওরা তিনজন তো ভাল ভাকবে সুখে থাকবে, একটু সময় না হয় কষ্টই হোক হাউসীর। শুধু একটু যদি জানতে পারতো হাসমত কই আছে।


এক বাড়ির কাজ শেষ করে অন্য বাড়িতে ছুটতে গিয়ে থমকে দাঁড়ায় 'লতা টেলিকম' এর সামনে। দুই টাকা মিনিটে কথা বলা যায়।


এলোমেলো পায়ে দোকানে ঢুকে মনে হয় হাসমতের মোবাইল ফোনের নম্বর হাউসীর জানা নেই। রাতে কাশেম মিয়ার কাছ থেকে নম্বরটা একটা কাগজে লিখে নেয়।


এরপর থেকে প্রতিদিন একই নিয়মে একই সময়ে হাউসী লতা টেলিকমে যায়। প্রথমেই গিয়ে লাল প্লাষ্টিকের চেয়ারে বসে তারপর আঁচল থেকে কাগজে লেখা নম্বরটা বের করে দোকানীকে দেয়, তারপর টাকা বের করে ততক্ষণে দোকানী হাউসীর নম্বর মেলাতে থাকে। এগারটা ডিজিট টেপা হয়ে গেলে তারে বাধা ফোনটা হাউসীর হাতে দেয়। হাসমতের নতুন জীবনে যুক্ত হবার আনন্দে ওর মুখে লক্ষ জোনাকীর আলো জেলে উঠে। মুহুতেই লোড সেডিং ঘিরে ধরে ওর সমস্ত মুখমন্ডলে। মোবাইলটা ফিরিয়ে দেয় দোকানীর হাতে?


আবার দেন কি কয় কিছুই বুঝবার পারি না।


দোকানী এবার রিডায়ালে চাপ দিয়ে কানে ধরে।


ফুন তো বন্ধ গো বইন।

ফুন বন্ধ ক্যা হ্যার ফুন তো কুনুদিন বন্ধ থাকে না।


: ফুন বন্ধ ক্যা হেইডা আমি ক্যামনে কমু কওতো দেহি।


হতাশ হাউসী নম্বরের কাগজটা আঁচলে বেঁধে ধীরে ধীরে উঠে পড়ে।


দোকানী ওকে বইন বলে সম্বোধন করলেও তার চোখে প্রতিদিনই একটু একটু করে উপেক্ষা গাঢ় হতে থাকে।


সকালের এই সময়টা কাষ্টমারের চাপ একটু বেশিই। এতদিনে দোকানীর জানা হযে গেছে হাউসীর নম্বরের অপর প্রন্ত কি বলবে। তাই অমন কাষ্টমারকে পাত্তা না দিয়ে বরঞ্চ বুড়োদের দেয়া নম্বরে কল দিলে বেশিলাভ। বুড়োরা একবার কথা বলতে শুরু করলে কিছুতেই শেষ করতে চায় না। কথার ডাল পালা গজাতেই থাকে। যদিও টাকা দেবার সময় অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে দোকানীর দিকে তাকায় ভুল ভাল সময়ের হিসাব দিয়ে বুঝি বেশিই টাকা নিল। সবচেয়ে ভাল কাষ্টমার হল হাইস্কুল পড়ুয়া ছাত্রীরা। ফোনটা বাইরে নিয়ে দোকানের কোন ঘেষে দাঁড়িয়ে কথা বলতেই থাকে বলতেই থাকে। কখনও কান্না কখনও হাসি কখনও শাসন কখনও প্রেমে গদ গদ।


টাকা দেবার বেলায়ও চুলচেরা হিসাবের ধার ধারে না, পঞ্চাশ টাকা বা বিশ টাকার নোটখানা ছুড়েই দৌড়।


আজ দোকানীর তাচিছল্যটা যেন ফেটে বেরুচ্ছে। এতদিনে হাউসী দোকানীর তাচ্ছিল্যকে উপেক্ষা করতে শিখে গেছে। দোকানী অনিচ্ছা সত্তে ও হাউসীর কাগজের টুকরো নিয়ে নম্বর মিলিয়ে ফোনটা হাউসীকে দেয়। হঠাৎই যেন হাউসীর মুখটা খুশীতে ভরে উঠে।


:


তুমি বাইত আহো না ক্যান।


হাউসীর কান ভরে যায় হাসমতের গমগমে কণ্ঠে।


: আমি তো বাইতই আছি।


: কুন বাইত আছো তুমি, আমি তো তুমাগো বাইতও গেছিলাম। আব্বায় কইলো গেল বছর তুমি আমাগো নিয়া গেছিলা হের বাদে আর যাও নাই। বউ মাইয়া ফালাইয়া কিসের লাইগা কই আছো তুমি।


: বউ তো লগেই আছে আর মাইয়া পামু কই, বিয়াই তো করছি দুইমাস আগে।


আপনে আসলে কারেচান।


হঠাৎই লাইন কেটে যায়, সাথে সাথেই 'আসলটা' ধরে ফেলে। সেটটা ফিরিয়ে দিতে গিয়েই দেখে ফ্যানের বাতাসে হাউসীর কাগজের টুকরা উড়ে টেবিলের তলায় পড়ে গেছে। দোকানী কাগজের টুকরা হাতড়াচ্ছে। হাউসী ওর হাতের ময়লা নোটটা টেবিলে রেখে পথে নামে।


ততক্ষণে দোকানী টুকরা কাগজটা খুজে পায়।


এই যে বইন তুমার নম্বর


হাউসীর নম্বর। চমকে উঠে থমকে যায়!! আঁচল তুলে মুখ মোছার ভঙ্গিতে চোখের পানি মুছে নেয়।


: লাগব না।


একবারও পেছনে না ফিরে এগুতে থাকে জনারণ্যে...

Powered by Blogger.

আসুন করনা সম্পর্কে সচেতন হই সুস্থ থাকি ।