TjT

করনা প্রতিরোধে হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার মেনে চলুন। অপরিষ্কার হাত দিয়ে চোখ, নাক ও মুখ স্পর্শ্ করা থেকে বিরত থাকুন। অ্যালকোহল যুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার হাতের তালুতে নিয়ে ( 20 সেকেন্ড ) ভাল করে পরিষ্কার করুন। ব্যবহৃত টিস্যু ঢাকনা যুক্ত ডাস্টবিনে ফেলুন। পরিচিত বা অপরিচিত ব্যক্তির সাথে হাত মেলানো বা আলিঙ্গন করা থেকে বিরত থাকুন। আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকুন।

অগ্নিস্পর্শ

ওদের গাড়ি যখন সাভার পার হচ্ছিল তখন শহরের শরীর থেকে ঘুমের কাঁথা সরতে শুরু করেছে মাত্র। অনিন্দিতা বসু অচেনা শহরের রূপ বাদামের খোসার মত ভেঙ্গে ভেঙ্গে দেখছে, তারপরও রয়ে যাচ্ছে পাতলা লালচে আবরণ, এটুকু ছাড়িয়েই চিনতে হবে শহরটার সত্যিকারের রূপ। আবদুর রব অবশ্য চেনানোর কাজটা করছে খুবই দক্ষভাবে। আবদুর রব- যার সাথে ওর কথা হয়েছে কাল রাতে, আর দেখা হয়েছে আজ ভোরে।


কাজল মিত্র বলেছিল বাংলাদেশে আবদুর রব নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়ে ফেরে। নিজের কাজের সীমানার বাইরের সময়টুকু নিজের লাভ ক্ষতি বিবেচনায় না রেখে ঢেলে দেয় জনসেবায়। ব্যাপারটা 'জনসেবায় আবদুর রব' এরকম আর কি। অনিন্দিতা ভাবে বেশির ভাগ বাঙালির মতো উনারও হয়তো রাজনৈতিক অভিলাষ টভিলাষ আছে, কাজল মিত্র সেটায় তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয় রাজনীতির বাইরেই সত্যিকারের জনসেবা সম্ভব।


শ্যামলী পরিবহনে বাংলাদেশে এসেছে গতকাল সন্ধ্যায়, তারপর দীর্ঘ দুঃসহ যানজট পেরিয়ে জয়াদের রাইনখোলার ফ্ল্যাটে যখন পৌঁছুলো, তখন মধ্যরাত। জয়ার উষ্ণ আতিথেয়তা গ্রহণ করে ফ্রেশ হয়েই ফোন দেয় আবদুর রবকে।


ওপ্রান্তের ভারী কণ্ঠস্বরের কাছে নিজের নামটা বলার সাথে সাথেই চিনে যায় এপ্রান্তের অনিন্দিতাকে। কাজল মিত্র কলকতা থেকেই অনিন্দিতা সম্পর্কিত সকল তথ্য এবং আসার উদ্দেশ্য যতটুকু নিজে জানে ততটুকু জানিয়েছে উনাকে। অনিন্দিতাকে সর্বপ্রকার সহযোগিতার কথাও জানিয়েছে, নইলে কি আর কাজল অনিন্দিতার বন্ধু। শুধু অনিন্দিতারই নয় ওর স্বামী সত্যময় বসুরও বন্ধু।


ফোনেই আবদুর রব ঠিক করে দেয় পরদিনের প্রোগ্রাম। ঠিক আটটায় ফোন বাজাবে জয়াদের ভবনের সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে। তাহলে কথা দাঁড়াচ্ছে ওকে জাগতে হবে সাড়ে ছটা নাগাদ, এতে অসুবিধা হবার কথা না- এমনিতেই ও আর্লিরাইজার।

আটটা বাজতে তখনও পুরো পাঁচ মিনিট বাকি। ঝরণার কুল কুল ধ্বনিতে বেজে উঠে জয়ার ফোন। কাল রাতে আবদুর রব সাহেবকে এই নম্বরটাই দেয়া হয়েছে। যতদিন অনিন্দিতা বাংলাদেশে থাকবে ততদিন জয়ার বাড়তি নম্বরটাই হবে ওর নম্বর।

ওদের এই যাত্রায় জয়ার ও সঙ্গী হবার কথা ছিল, কিন্তু শেষ রাত থেকে প্রচন্ডত্ত্বরে কাতরাচ্ছে। ঔষধ টোষধ খেয়ে জ্বর সামলেই সঙ্গী হতে চেয়েছিল কিন্তু কিছুতেই রাজী হয়নি অনিন্দিতা। বিব্রত জরাক্তান্ত জয়াকে ওর স্বামী ও কাজের মেয়ে এবং ঔষধের হেফাজতে রেখেই যাত্রার জন্য প্রস্তুতি নেয়। প্রোগ্রামটা বদলে ফেলতে চেয়েছিল কিন্তু ভিসা টিকেট ছাড়াও একটা তাড়না চোখ রাঙ্গিয়েছে অনিন্দিতাকে।


জয়ার তপ্ত গালে হাত রেখে মনে হয়, ভদ্রলোক নিচে অপেক্ষা করছেন। দেরী করানোটা ভদ্রতার সীমা অতিক্রম করার পায়তারা করছে। আর দেরী নয়, দ্রুত সিড়ি ভাঙ্গতে থাকে, একদম গোড়ার সিড়িতে দাঁড়িয়ে মনে হয় গতরাতের কণ্ঠে পরিচিত ভদ্রলোককে চিনবে কি করে, হাতের সেলফোনটার দিকে তাকিয়ে কুল পায় সমস্যার।

গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছে সাদা রঙের এক্স করোলা। হাফ ছেড়ে লাষ্ট কলটার রিং বাজাতেই গাড়ির ভেতর থেকে নেমে আসে দীর্ঘদেহী মেদহীনএক পুরুষ। গভীর নীল জিনস এর সাথে মানানসই টি সাট তার ব্যক্তিত্বকে ধরে রেখেছে পোক্ত করে। রিংটা তখনও বাজছে। বুঝতে অসুবিধা হয় না সামনে দাঁড়ানো এই ভদ্রলোকই তার প্রার্থিত জন। হেসে গাড়ির দরজা টেনে অনিন্দিতাকে ভেতরে বসার অনুরোধ করে চোখের দৃষ্টিতে। গাড়িতেই দুজনের কথা হয় পথের দুরত্ব পেরুতে পেরুতে।


বেশ খানিকটা পথ ভেঙ্গে গাড়ি থামে, দুজনেই বেরিয়ে আসে।

এটা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণে নির্মিত জাতীয় স্মৃতিসৌধ।


আপ্লুত হয়ে এগিয়ে যায় অনিন্দিতা, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ-স্মৃতিসৌধ। এগুলোর সাথে কেমন যেন এক নিরবিছিন্ন নৈকট্য অনুভব করে।


স্মৃতিসৌধ পরিচালিত হয় সরকারি ব্যবস্থাপনায়, দাপ্তরিক নিয়মানুযায়ী সর্বসাধারনের জন্য খুলে দেয়া হয় অফিস সময়েই। এখন পৌনে নটা, খুলতে বেশ দেরীই হবে, তাই বাইরে থেকেই শ্রদ্ধা জানায় এদেশের বীরদের প্রতি।


গাড়ি চলতে শুরু করে বৃক্ষপত্র-সেতুর ছায়া ভেঙ্গে ভেঙ্গে চমৎকার সবুজ পথ পেরিয়ে পৌঁছে যায় আরো নিবিড় সবুজ গ্রামে। আবদুর রবের অফিস চত্বরে এসে গাড়ি থামে। এটা ঠিক উনার কর্মক্ষেত্র নয়, উনি হেড অফিসের বড় কর্মকর্তা। উনার আগমনে রীতিমত হৈ চৈ পড়ে যায়। সালাম সম্ভাষণের ভেতর দিয়েই আবদুর রব অফিসে প্রবেশ করে। অনিন্দিতা চত্বরেই দাঁড়িয়ে থাকে, ভেতরে যাবার আমন্ত্রণ এড়িয়ে।

ঘুরে ঘুরে চারদিকে চোখ বুলাতে থাকে। এটা একটা বেসরকারি সংস্থার শাখা। অফিস। এই সংস্থার কাজেরক্ষেত্র বহুমুখী সবকর্মই মাটি মানুস ক্ষুধা দারিদ্রকে কেন্দ্র করে।


চত্বরের এককোনে বেশ খানিকটা জায়গা নিয়ে গড়ে উঠেছে যে নার্সারী তাতে সন্ত্রস্ত মুরগীর মতো প্রবেশ করে। হাটু সমান উচ্চতার আম গাছে ঝুলছে থোকা থোকা আম। কাঁটাময় গাছের শীর্ষে লাল ঠোঁটের হাসির প্রস্ফুটিত গোলাগের সুবাসে সিক্ত হতে হতে ঝুলন্ত সোহাগী আমের গায়ে হাত বুলোয়। চোখের দৃষ্টি ছড়িয়ে দেয় দূরের গ্রামে। কুঁড়েঘরের ফাঁক গলিয়ে ঝকঝকে টিনের ঘর এমন কি ইটের তৈরি ঘরও চোখে পড়ে।


এটা আসলে গ্রাম ছোঁয়া মফস্বল। অফিসের সামনের রাস্তাটাই হয়তো গ্রামের একমাত্র পাকা সড়ক। জিনস্ কেডস্ পরা যুবক সেল ফোনে কথা বলতে বলতে হেঁটে যাচ্ছে। তার পাশ দিয়ে লাঙ্গল জোয়াল কাঁধে, গরুসহ এক ভূমি শ্রমিক হেটে যায়। টুন টুন বেল বাজিয়ে সাইকেলের হ্যান্ডেলে দুধের বালতি চাপিয়ে সদর্পে হস করে হারিয়ে যায় কেউ একজন। মধ্যবয়সী রমনী ঘোমটা টেনে দ্রুত হাঁটছে। নদীর কলকল রব তুলে স্কুল পড়ুয়া কিশোরীর তরঙ্গ আছড়ে পড়ে পাকাসড়কে।


নার্সারী থেকে বেড়িয়ে একেবারে ডাইনিং হলে, কেন্টিনের খাবার হলেও বেশ স্বাদু এবং পরিচ্ছন্ন। চা তৈরি করে অনিন্দিতার হাতে তুলে দিয়েই জানিয়ে দেয় আবদুর রব, চা-টা শেষ করেই ওরা যাবে জমিদার বাড়িতে। 


ঠোঁটের স্পশ বঞ্চিত রেখে কাপটা হাতে ধরেই প্রশ্ন করে অনিন্দিতা।


: জমিদার বাড়ি এখান থেকে কতদূর।


: মূল বাড়ি দেয়ালের পেছনেই, এই যে এখানে বসে চা খাচ্ছি এটাও কিন্তু এক


সময় ঐ বাড়িরই অংশ ছিল।


এটাই কি?


জমাট বাঁধা চমকটা ভেঙ্গে যায়। অনিন্দিতার মুখের কথা খপ করে ধরে ফেলে আবদুর রব।


: আপনার খুঁজতে আসা বেলীশ্বর গ্রাম।


ছলকে উঠে অনিন্দিতার হাতে কাপ ভর্তি আগুন গরম চা, বেশ খানিকটা উপচে পড়ে যায় ওর উরুতে। ভাগ্যিস দুপরত শাড়ী আর এক পরত পেটিকোট ছিল। নইলে বলকানো গরম পানিতে ফোস্কা পড়ে যেত উরুর ফর্সা নরম চামড়ায়। এখন হয়তো লাল টকটকে হয়ে গেছে। বেশ জ্বালা করছে, জ্বালাটা হজম করছে সামনে বসা আবদুর রবের জন্য।

পাকা রাস্তার সংযোগে একটা গলি পথে নামে ওরা। বর্ণনায় মুখর আবদুর রব। আশ পাশের জায়গাও এক সময় জমিদারেরই ছিল। মানুষ জন কিনে বাড়ি তৈরি করে পরিবার পরিজন নিযে বসবাস করছে। গলি পথ থৈ থৈ করছে বাড়িগুলোর সাংসারিক শব্দে।


গলি পেরিয়ে ওরা নামে খোলা প্রান্তরে, জোড়া পুকুরে, মায়ের মতো স্নেহের ছায়া দিয়েছ প্রাচীন বৃক্ষ। পুকুরের দুই ধারে শান বাঁধানো ঘাট। পূর্বে হয়তো এটাকে দীর্ঘি নামেই ডাকা হতো। দক্ষিণ পাশের পুকুরটা নতুন কাটা হয়েছে, পাশের রাস্তা তৈরির প্রয়োজন। মনোবেদনায় দাঁড়িয়ে আছে দেবীশূন্য মন্দির। অযত্ন অবহেলায়

পূজোর সময় মন্দিরে দেবী তোলা হয়, খোলা হয় অতিথি শালা, সামনের চত্বরে খুব জম জমাট মেলা হয় সাতদিন ধরে হিন্দু, মুসলমান সবাই খুব আনন্দ করে।


থম ধরা বুকে মন্দিরের সামনে দাঁড়ায়।


দেরোত্তর জমি বলেই হয়তো বিক্রি বা দখল করতে পারছেনা।


নিজে নিজেই বলছে আবদুর রব।


দখল কোথায় নেই বলুন তো


অনেক পরে কথা বলে অনিন্দিতা। পাশের বাড়ির মালিক সনাতন ধর্মের বলেই মনে হচ্ছে।


দুজনে হাঁটছে খোলা প্রান্তরে। জমিদার বাড়ির সামনে দাঁড়ায় ওরা। আবদুর রব গেট


পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে যায়। অনিন্দিতার চোখ আঁটকে যায়, পুরোনো বনেদী আলিশান দালানে।


বুকের ভেতরটা তখনকার কাপভর্তি গরম চায়ের মতো ছলকে উঠে, ওর মা এই বাড়ির মেয়ে, মায়ের শৈশব কৈশোর যৌবন এই বাড়ি এই গ্রাম ঘিরে।


খুব সাবধানে মাটিতে পা ফেলে ফেলে এগিয়ে যায়, যেন একটু জোরে পা ফেললেই


ব্যাথায় কঁকিয়ে উঠবে মায়ের জন্মমাটি।

আমি এইখানে বসছি, আপনি ঘুরে ঘুরে দেখুন।


নির্জন অরণ্যে পাখির শীষের মত বেজে ওঠে আবদুর বরের কণ্ঠ। এমন একাকী পরিবেশই চাইছিল অনিন্দিতা, তবুও ভদ্রতার জন্য মুখ ঘুরিয়ে দেখতে পায় একটা গাছের নীচে সিমেন্টের তৈরি রোয়াকে বসার উপক্রম করছে। দুজনের চোখে অভিব্যক্তিহীন দৃষ্টি বিনিময় হয়।


তীর্থস্থান দর্শনের পবিত্রতায় এগিয়ে যায়, ওর ভেতরে রাখা বাড়িটার দিকে।

বাড়ির একেবারে পেছনে চলে এসেছে। মায়ের শৈশব স্মৃতির স্পর্শে সজীব বৃক্ষগুলো কালের সাক্ষী হয়ে বাড়িটাকে পাহারা দিচ্ছে সতর্ক দৃষ্টিতে। প্রণামের ভঙ্গিতে বৃক্ষগুলোতে সম্মান ও মমতার স্পর্শ বুলায়। বুলায়। বয়েসী বৃক্ষগুলোকে দূরে ঠেলে গোত্রবন্ধ হয়ে আছে বাঁশঝাড়, স্বজনকে দেখে চিরল চিরল পাতার ঘর্ষণে নৃত্য করে উঠে। এটাই যেন ওদের অভিবাদনের ভঙ্গি।


অভিসিক্ত অনিন্দিতা মূল উঠোনে দাঁড়ায়। ভবনটা চর্তুভূজ আকৃতির দ্বিতল ভবন। চৌকো উঠোনের চারপাশ শান বাঁধানো। মাঝখানটা তাজা মখমল ঘাসে ঢাকা। ঘাসের নিচে রয়েছে সজল মাটি, যেমন যান্ত্রিক যুগে বাস করেও অনিন্দিতার বুকে রয়েছে বোধ, দায়, মমতা, কান্না।


উঠোনের ঘাস মাড়িয়ে অনিন্দিতা ভবনে উঠে যায়।


বেশ পুরানো ভবন এটা, দেয়ালগুলো লোনাধরা মেঝেরও খাবলা খাবলা প্লাস্টার ওঠে গেছে। একটু দাঁড়ায় ও, চারদিকে চোখ বুলাতে থাকে।


ভবনটা যিনি কিনেছেন তিনি হয়তো নানাবিধ অভাবে বাড়িটার যথাযথ সংস্কার করতে পারছেন না। জমিদার বাড়ি কিনে এলাকায় নিজের সম্মান বৃদ্ধির প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। এটার পেছনে মিছিমিছি শ্রম আর অর্থ ঢালা কেন? ভবনটার অনাদর আর অবহেলা দেখে বুকে ছোট্ট একটা পিঁপড়ার কামড় অনুভব করে।


বারান্দার মাঝমাঝি উপরে উঠার কারুকার্যময় ঘোরানো কাঠের সিড়ি। দু'ধাপ সিড়ি ভাঙ্গতেই দেখে ভেজা কাপড়ে তৃণমূল পর্যায়ের একজন নারী দাঁড়িয়ে আছে। একটু আগে এই নারীকেই কি দেখেছে পুকুরে সাঁতার কাটতে? খুটিয়ে খুটিয়ে নারীটি ওকে দেখছে।


: কই থে আইচেন গো আপনে, কারে চান।


: উপরে কি কেউ থাকে।


: না কেউ থাহে না, আমরাই ঘরে বাইরে দুইজন ঘর দুয়ার পাহারা দেই।

ঘরে একজন বাইরে একজন, কই কাউকে তো দেখলুম না বাইরে।


: ঘরে বাইরে অইলো গিয়া স্বামী স্ত্রী, আমরা স্বামী স্ত্রীই এই বাড়ি দেখশোন করি।


বাড়ির মালিক কই।


: এইডা অইলো গিয়া জমিদার বাড়ি, মদন মোহন রায়ের কাছ থিকা আমাগো মালিক পিন্সিপাল সাবে কিনা নিছে অহন পিন্সিপাল সাবেও ঢাকা থাকে হ্যারাই মাঝে মইদ্দে বেড়াইবার আহে। হ্যাগো পুলাপানেরাও বিদ্যাশ থাকে হ্যারা যুদি দ্যাশে আহে তাইলে ঢাকা থনই যায় গা। গেরাম ঘরে আর আহে না। পিন্সিপাল সাবে আমার স্বামীরে রিক্সা কিনা দিছে হে রিক্সা চালায়, আমি সমিতির সিলাই করি।

মদন মোহন রায়ের পূর্ব পুরুষের কত সাধের বাড়ি, গৌরবের বাড়ি, নিরাপত্তার বাড়ি। অনিন্দিতার সামনে যে মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে, ওর পূর্ব পুরুষেরা হয়তো এই বাড়ির সামনে দিয়ে হেটে যাবারও অনুমতি পেত না। অথচ ওদেরই উত্তরাধিকারীরা আজ এই বাড়ির তত্বাবধানে রয়েছে। সিড়ির শেষ মাথায় উঠে খেয়াল করে ভেজানারীটি পেছনে পেছনে আসছে।


: আমি যদি বাড়ীটি ঘুরে ঘুরে দেখি তোমার কোন আপত্বি আছে।


নাটকের শুটিং করবেন না কি গো। :


: নাটক


: হ গো ম্যালা মাইনসে আহে, কত সোন্দর সোন্দর মাইয়া পুলা মুখে রং মাইখা ঢং করে। ক্যামেরা দিয়া ফুট তুলে, হেগুনা আবার টি বি তে দেহায়। আমাগো তো টিবি নাই তাই দেখবার পারি না গো বইন।


'বইন' মানে বোন! চমকে উঠে অনিন্দিতা মদন মোহন রায়ের নাতনীকে কোন দুঃসাহসে এক মুসলমান বিত্তহীন নারী নিজের স্বজন ভেবে নিয়েছে। দ্বিধান্বিত পায়ে হাটতে থাকে। 1


খালাম্মায় কইছে হ্যার পুরান টিবিডা এইবার আইবার সুময় আমাগো লিগা নিয়া আইব, তহন নাটক দেখবার পারুম।


উত্তরের খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়েই অনিন্দিতা, মুখ ফিরিয়ে দেখে ভেজা কাপড়ের নারীটি তখনও ওর পেছন পেছন আসছে। নারীটি থেকে একটু দূরে ওর দৃষ্টি ছড়ায়। শরীর চুইয়ে চুইয়ে পানি নামছে মেঝেতে, যতদুর ওরা হেটে এসেছে ততদূর জলের রেখায় পদচিহ্ন ফুটে আছে। একটু পরেই বাতাসে বাস্প হয়ে যাবে জল রেখারও কোন চিহ্ন থাকবে না। মেঝের জল ছবির দিকে তাকিয়েই বলে

তোমার নাম কি?


: ব্যাকেই আমারে শওকতের বউ কইয়াই ডাহে।

এটা তো তোমার নাম না, তোমার মা বাবা কি নামে ডাকতো।


:


হ্যারা কইতো গেদি, স্কুলের হেড সারে খাতায় নাম লেখছিল আসমা আক্তার। আমি কইলাম কেলাস ফাইভ নাগাদি পড়ছি।


অনিন্দিতা আসমার ভেজা ভেজা মুখে তাকায়, নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতার পরিচয়, দিতে পেরে বেশ পরিতৃপ্ত বোধ করছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা দিয়ে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীর উচ্চপদে আসীনের পাশে অনায়াসেই জায়গা করে নিয়েছে আসমা।

এতোক্ষণে অনিন্দিতা বুঝে গেছে আলাপী আসমা রক্ষকের কাজটি দক্ষভাবেই করছে। স্বর্গীয় দাদু মশাইকে মনে হতেই একটা কষটে বরুইয়ে কামড় পড়ে যেন, ঢোক গিলে কষটে রসটুকু ভেতরে নিতেনিতেই আসমার পিঠে হাত রাখে। বেশ কয়েকদিন থেকেই এমন হচ্ছে দাদু মশাইকে মনে হলেই এমন কষটে বরুইয়ে কামড় পড়ে। অথচ দাদু মশাইকে কতই না ভালোবাসতো অনিন্দিতা। দাদু কি কম ভালোবাসতো অনিন্দিতাকে।


হঠাৎ ওর একটা হাত যায় গলায়, চব্বিশ ক্যারেটের একটা সোনার চেন ঝুলছে, সেখানে, এটাওতো দাদু মশাইয়ের দেয়া।


: আসমা বোন, তুমি নিচে গিয়ে তোমার কাজ করগে, আমি একা একা থাকি একটু ক্ষণ।


প্রতিটি কক্ষেই ঝুলছে মজবুত তালা। এই অচেনা অতিথি বড় জোড় বারান্দায় হাটতে পারবে। তালা খোলার ব্যর্থ চেষ্টা করলে নিচ থেকে তার শব্দ তো পাওয়াই যাবে ভেবে দ্রুত চলে যায় আসমা।


খোলা বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়ায়। চোখ যায় খোলা ক্ষেতের কোল ঘেষে সারিবদ্ধ বসতি দিকে। প্রতিটা বাড়ির বহিরাঙ্গণে ঘুরছে মুরগীর দল। একটা বাড়ির গাছের সঙ্গে বাঁধা লাল রঙ্গের গাভী, একটু দুরে একটা বাছুরও বাঁধা, বাছুরটার ওর সামনের খাবার দেয়া হয়েছে তবুও বাছুরটা মাতৃ সান্নিধ্যের জন্য হাম্বা হাম্বা করছে। ব্যাথিত চোখ দুটো সরিয়ে নেয় অনিন্দিতা।


পাকা রোদে ঝলসে যাচ্ছে কাঁচা মাটি তোলা সড়ক। কর্মক্লান্ত এক কৃষক সড়কের কোল ঘেষে বেড়ে উঠা বৃক্ষের নীচে জিরিয়ে নিচ্ছে। হোন্ডা সাইকেলে লোকজন চলাচল করছে। পায়ে হেটেও কেউ কেউ চলছে। পথ তো পথিকের চলাচলের জন্যই। সব কিছু ছাপিয়ে ওর চোখ খুঁজতে থাকে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি পেরিয়ে পূর্ণ পাতার রঙের গ্রামকে। সেখানে ছোট্ট একটা কুঁড়ে ঘর সেই ঘরে নিত্য সঙ্গী অভাব। সেই বাড়ির মা বাবা অভাবকে পরনের জামা করে গায়ে দিয়েও সুখী ছিল, সুখের কারণ ছিল তাদের একমাত্র পুত্র জসিম।


মদন মোহন রায় পূর্ব পুরুষের জমিদারী কাগজ কলমে না পেলেও পেয়েছিল অঢেল ভূসম্পতি। নিজের ছিল বিরাট ব্যবসা। ভুমি সম্পতি গুলো গ্রামের বর্গা চাষীদের কাছে থাকতো শর্ত সাপেক্ষে। জসিমের বাবাও ছিল মদন মোহন রায়ের বিশ্বস্ত বর্গা চাষী এবং মেধাবী জসিমের গর্বিত পিতা।


নিত্য অভাবের মাঝেও জসিম বুক চিতিয়ে কলেজে যেত। মদন মোহন রায় জসিমের মেধার কথা জানতে পেরে কন্যা মনোরমার গৃহশিক্ষক নিয়োগ করেন। জসিম অল্প দিনেই মদন মোহন রায়ের বিচক্ষণতার পরিচয় দেয়। এই গ্রামের প্রথম প্রবেশিকা পাশ করে মদন মোহন রায়ের একমাত্র কন্যা।


প্রবেশিকা পাশের পর আত্মবিশ্বাস, সাহস, উৎসাহ বেড়ে যায় মনোরমার। ভর্তি হয় ধামরাই কলেজে যদিও মুরুব্বীরা আপত্তি তোলে কি হবে পড়ে এমনিতেই কম কিসে মনোরমা। নামী বংশের দামী পিতার সুন্দরী সুশীলা কন্যা। মনোরমার এক রা সে পড়রেই।


সদা ধবধবে ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে কলেজে আসে মনোরমা, সবাই জমিদার কন্যা বলে সমীহ করে দূরে দূরে থাকে, এমন কি গৃহশিক্ষক জসিমও পর্যন্ত। মনোরমার ব্যবহারে মুগ্ধ হয় সবাই, দুরত্বও ঘুচে যায়।


নিজের বিলাসবহুল বাড়িতে শামুকের মত গুটিয়ে থাকা জসিমকে আবিস্কার করতে পারেনি। কলেজের সবুজ চত্বরে বুঝতে পারে জসিমের ভেতরের আগুনকে। যখন তখন দরাজ গলায় গান ধরে, সিরাজদ্দৌল্লার অভিয়ন করে মাতিয়ে দেয়। কখনও সখনও বাঁশির সুরে উদাস করে মনোরমাকে। খুব সহজেই মনোরমার মুগ্ধ আবরনটি রূপান্তরিত হয় ভালোবাসায়।


ছন সরে যাওয়া চাল গলে জসিমের ছেঁড়া কাঁথায় রাতে আকাশ ভেঙ্গে নামে জোছনার ঢল। ওর সারা গায়ে উছলে পড়ে জোছনা! প্রাণপণ প্রচেষ্টায়ও একটুকরো জোছনাকে মুঠোবন্দি করতে না পারার অক্ষমতায় নির্ঘুম কেঁদে কাটায় বাকি রাতটুকু। সকালে ওর ভেজা চোখ দেখে প্রশ্নে মুখর হয় মনোরমা। জসিম মনোরমার ভালোবাসাময় মুখের দিকে তাকিয়ে বলতে পারে না ধর্ম আর অর্থনৈতিক ব্যবধানের প্রকট প্রাচীরের কথা।


একদিন মনোরমা ঠিকই ধরে ফেলে জসিমের কুণ্ঠার প্রাচীরকে। প্রাচীরের উচ্চতা ডিঙ্গিয়েই জসিমের প্রেমের কাছে সমর্পণ করে নিজের সকল ঐশ্বর্য।


ওদের ভালোবাসার বসন্ত সমারোহের মধ্য দিয়েই আই, এ পরীক্ষা সম্পন্ন হয় মনোরমা। জসিম ওর বি.এ.পাশের সাটিফিকেটগুলো নিয়ে ঢাকায় আসে চাকরির সন্ধানে।


চাকরির বাজারে মামা চাচার দাপট চিরকালই যোগ্যতার মাপকাঠি হিসাবে বিবেচিত হয়েছে। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে যেন তেন একটা চাকরি জুটিয়ে যখন বেলীশ্বর গ্রামে পৌছে তখন কালিগঙ্গায় অনেক পানি গাড়িয়েছে।


মদন মোহন রায়ের সুউচ্চু প্রাচীরের অন্তরালে আঁটকে আছে জসিমের হৃদপিন্ডের শব্দটুকু।

পনর দিন আগের একটা চিঠিতে মনোরমা জানিয়েছিল ওর ভেতর বেড়ে উঠছে জসিমের প্রাণের একটা বিন্দু।


তিন চার দিন অন্তহীন চেষ্টা করেও মনোরমার দেখা পায় না, অবেশষে এক শেষরাতে বাড়ির উত্তর দিককার প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে ঘোরানো সিড়ি ভেঙ্গে ভেঙ্গে মনোরমার ঘরে গিয়ে দাঁড়ায়।


জসিমের সামনে এ কোন মনোরমা। হাত পা গুলো পানিতে ফুলে আছে! পেট মুখ সমান্তরালে বেড়ে উঠেছে। চোখের নিচে কে যেন কালির দোয়াতে কাপড় চুবিয়ে ঘসে দিয়েছে। দুঃচিন্তায় মুখটা শুকনো।


দুজনে হিসেব মিলিয়ে দেখে মনোরমার পেটে জসিমের প্রাণ বাস করছে দীর্ঘ সাতমাস ধরে! জসিম মনোরমার স্ফীত পেটে কান লাগিয়ে শিশুর স্পন্দন শুনে পুলকিত হয়। এই শিশু ওদের ভালোবাসার সন্তান! এই সন্তান ওদের বিশ্বাসের সন্তান।


মনোরমা জানায় মদন মোহন রায় সিদ্ধান্ত নিয়েছে কিছুতেই যেন এই সন্তান পৃথিবীর আলো বাতাস দেখতে না পায়।


চেতানো বুক নিয়ে দাঁড়ায় প্রতাবশালী মদন মোহন রায়ের সামনে! চিরকালের স্বল্পভাষী মদন মোহন রায় কোনদিনই তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে নি। বংশ পরম্পরায় প্রাপ্ত সম্মান রক্ষা করার দায়িত্ব তার কাছে মহান কর্তব্য। পিতার স্নেহের কাছে কোন ভাবেই সেই কর্তব্যে হেরে যাবে না।


যে জসিমের পূর্ব পুরুষেরা কোন দিনই রায় পরিবারের সামনে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলতে সাহসী হতো না। কোন মন্ত্র বলে জসিম আজ তেজী বাঘ হয়ে গেল। ওর পূর্ব পুরুষ বিনা প্রতিবাদে নিজেদের পরিশ্রমের ফসল তুলে দিতো রায় বাবুদের গোলায়। সেই ঘরের জসিমই আজ নিজের ফসলে ছাড় দিতে রাজী নয়। রায় বাবুই প্রস্তাব দেয় জসিম শুধু ওর সন্তান পাবে, তবে শর্ত হলো সন্তানসহ জসিম কোন দিনই এই গ্রামে বসবাস করতে পারবে না।


গভীর সমুদ্রে ডুবন্ত মানুস যে ভাবে খড়কুটো আঁকড়ে বাঁচতে চায় তেমনি ভাবেই রাজী হয় জসিম। মনের মধ্যে অজানা শঙ্কা নিয়ে বাড়ি ফেরে, পৃথিবী বিসর্জন দিয়ে পল পল করে প্রহর গুলো সপ্তাহে রূপ নেয়।


রায় বাবুর দেয়ালের পাশে একটা গাছের নীচে গাছের ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল জসিম। মধ্যরাতে সচকিত হয় গাড়ির শব্দে। নিজে নিজে বুঝতে চেষ্টা করে কি হতে পারে?

বহু অনুনয় বিনয়ের পর দারোয়ান জানায় ঢাকা থেকে ডাক্তার কল্যানীকে আনা হয়েছে। জসিমের সমস্ত চেতনা সজাগ হয়ে উঠে। ওর বোধ ওকে জানান দেয় মদন মোহন রায়রা বড় লোক, উচু পরিবারের মানুষ। তার কাছে তার বংশ ময্যাদার দাম জীবনের চেয়েও বেশি। জসিমের সন্তান বেঁচে থাকামানেই হল এই পরিবারের জন্য কলঙ্ক। নিজের কর্তব্য ঠিক করে ফেলে।


একটাই সড়ক এই গ্রামের। সড়কের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে থাকে। ভোরের আলো তখনও পৃথিবীতে এসে পৌঁছায় নি। সাদা রঙের গাড়িটা সন্তপর্ণে আসছিল। পথ আটকে দেয় জসিম। ডাক্তার কল্যানী ব্যানার্জীকে বাধ্যকরে সত্য প্রকাশে।


বাতাসের চেয়েও দ্রুত ছুটে গিয়েছিল জসিম। মদন মোহন রায়ের মুখোমুখি আজ হতে হল না। তার নিখুঁত ব্যবস্থাপনায় পরিচয় মিললো।


কয়েক দিনের মধ্যেই রাতের আঁধারে ধরে বেঁধে মনোরমাকে কলকাতা পাঠিয়ে দেয়া হয়। সময় সুযোগ বুঝে পুরো পরিবার এদেশ ছেড়ে চলে যায় এবং বসতি গড়ে গাঙ্গনা পুর গ্রামে।


গত মাসে মা অনিন্দিতাকে ডাইরীটা দিয়েছে। ডাইরীতে সব লেখা ছিল না। মনের আগল খুলে উজার করে দেয় বুকের সিন্দুকে রাখা সব কথা আত্মজার কাছে।


স্মৃতির ভারে মসৃণ বারান্দায় বসে পড়েছে অনিন্দিতা। রেলিং ধরে দাঁড়াতেই চোখে পড়ে পুরানো রান্নাঘরের পাশে কামরাঙ্গা গাছে ঝিরি ঝিরি পাতাগুলো বাতাসের মিষ্টি ছোঁয়া পেয়ে আদুরে ভঙ্গিতে গান গাইছে। আরে এটা সেই গাছটা। যেখানে পোঁতা হয়েছিল মায়ের নাড়িছেড়া ধনকে। প্রাণপণ প্রচেষ্টায় শিশুটি যখন পৃথিবীকে জানান দিচ্ছিল তার অস্তিত্ব। ঠিক তখুনি মন্দাকিনী মাসী শিশুটির মুখে ঠেষে পুরে দেয় মুঠো ভর্তি লবন!


কি নিষ্ঠুরতা। অনিন্দিতার বুকটা কেঁপে উঠে। ঘৃণায় মুখটা বেঁকে যায়, মুখ ভর্তি থুথু নিচে ফেলে।


কামরাঙ্গা গাছটি জড়িয়ে বড় বড় শ্বাস টানে গাছ ধরে বসে পড়ে গাছের গোড়ায়।


গোড়ার মাটি খামচে সরাতে থাকে শেকড় স্পর্শ করার জন্য।


:


কি করতাছেন গো, হাতে তো ময়লা লাইগা গেলগো বইন।


চমকে তাকায় দেখে আসমা নিঃশব্দে এসে ওর পাশে দাঁড়িয়েছে, মুহুর্তেই নিজেকে সামলে নেয়।


এ গাছটার এখনও ফল ফলে নাকি?


ফলব না ক্যা, আটাশির বইন্যার পুরানডা মইরা গেলে বেগম সাবে ঢাকা থিকা কলমের চারা আইনা পুঁতছে।

হাজার ভোল্টের শক খায় আনিন্দিতা। এটা সেই গাছ নয়, যে গাছের শেকড় শুষে নিয়েছিল ওর সহদরের রক্ত মাংসের নির্যাস।


গাছ ছেড়ে দাঁড়াতেই দেখে বড় বড় পিপড়া সারিবদ্ধ ভাবে উপরে উঠছে।


আপনে ক্যারাগো বইন


প্রশ্নটাকে হাত নেড়ে মাছি তাড়ানোর মত করে সরায়।


তুমি না বললে এইবাড়ির আসল মালিক মদন মোহন রায়, তুমি তাকে দেখেছ চেন তাকে?


আমি হ্যারে দেখমুই বা কেমনে চিনমুই বা কেমনে। হ্যারা যহন দ্যাশ ছাইড়া গেছে, তহন তো মায়েই ছোড আছিল। আবার এহেবারে ছোডও না। আমার মায়ের কাছে হুনছি তাগো কথা। রায় বাবু গো বাপ দাদারা আছিল জমিদার। হে জমিদার না থাকলেও বেকেই হ্যারে জমিদারই কইতো। হেই রায়বাবুর আছিল পরীর লাহান সোন্দর একটা মাইয়া। পরানের চাইয়াও ভালোবাসতো হেই মাইয়ারে জমিদার বাবু। মাইয়াডা মরনের কালে বাপের কোলে মাথা রাইখ্যা কইয়া গেছিল এই গেরামে মেয়াগো লিগা একটা স্কুল করনের কথা। মাইয়া মরনের পর বাপ হ্যার কথা রাখছে।


জমিদারের মেয়ে কিভাবে মারা গেছে।


আশ্চর্য হয়ে যায় আসমার কথায় অনিন্দিতা


কলেরা। একরাইতে বুইলে সাদা কাপড় পিন্দা শীতলাদেবী এই গেরামে ঢুকছিল! কুনু বাড়িই দেবীর পছন্দ অইলো না পছন্দ অইলো এই জমিদার বাড়ি। শীতলদেবীর কেউরে পছন্দ অইলোনা পছন্দ অইলো পরীর লাহান সোন্দর মাইয়াড়ারে। জমিদারের মাইয়াতো, হ্যার চিন্তা ভাবনাও বড়। তাইতো মরনের কালেও দ্যাশের মাইয়া গো কথা চিন্তা কইরা একটা ভাল কাম কইয়া গেছে। আমাগো আল্লা আপনে ভগবান হ্যার ভাল করুক।


আসমা রায়বাবু পরীর মতো সুন্দর মেয়েকে মৃত ভেবে মঙ্গল কামনা করছে। অনিন্দিতার চোখে ভাসছে সন্ট লেকে দাদার কেনা ফ্ল্যাটের কোনার ঘরটায় শুভ্র পোষাকে বাবার ছবির সামনে বসে আছেন মা। অনিন্দিতাকে চুপ থাকতে দেখে মুখর হয় আসমা।


: এই স্কুলের ছাত্রীরা ডাক্তার অইছে, অহন দুইজন এই স্কুলে পড়ায় তারাও এই স্কুলে পড়ছে। কত বড় বড় চাকরি করে এই গেরামের মাইয়া হ্যারা এই স্কুলেই পড়তো। খালি আমিই কিছু অইতে পারলাম না। বাপে আছিল গরীব।

ক্ষেদ ঝাড়ছে আসমা।


1


: তুমি উত্তর পাড়ার জসিমকে চেন। এই গ্রামের প্রথম বি.এ পাশ এখন অবশ্য বুড়ো ফুড়ো হয়ে যাবার কথা।


: আপনে আমাগো জসিম কাকুর কথা কইতাছেন, হেআছিল আমার বাপের বড় চাচার পোলা। হারাদিন পড়তো, পড়তে পড়তে এক রাইতে কেউরে কিছু না কইয়া হাউরা উদ্দিশ্যে কোনো জানি গেছাল গা। ম্যালা বছর বাদে ফিরা আইছিল, ফিরা আইলে অইব কি হ্যার মাথায় গন্ডগোল। হারাদিন খালি প্যাচাল পারতো ক্ষ্যাণে ক্ষ্যাণে গানও গাইতো কেউ ভাত দিলে খাইতো না দিলে খাওনও চাইতো না।


:


: তুমি আমাকে তার কাছে নিয়ে চল আসমা।


হ্যারে কোনে পাইবেন। গেল বাইষায় পানিতে পইড়া মইরা ভাইসা গেছে গা গো।


কেউ দেখল না একজন মানুস পানিতে পড়ে ভেসে গেল?


অনিন্দিতার বুক চিড়ে তীক্ষ্ণ আওয়াজ বের হয়।


: দেখব কেমনে গো, ব্যাবাকেইতো গরু ছাগল পুলাপান গো থাকোনের জায়গার চিন্তায়ই অস্থির। ঘরে নাই খাওন। থাকোনের জায়গা নাই গো। ক্যারা বুইড়া পাগলরে নিয়া ভাববে গো।


: তাই বলে একটা জলজ্যান্ত মানুষ, পাগল হোক তবুতো মানুষ।


: থাউক বইন, জসিম কাকুতো মইরা বাঁচছে গো বইন। আপনে মনোরমা মঠ দেখবেন।


: মনোরমা মঠ। সেটা আবার কি।


: মদন মোহন রায়ের পরীর লাহান মাইয়ার নামই তো মনোরমা। মাইয়া মরনের পর যেহানে মাইয়াডারে পোড়াইছে হেই জায়গায় একটা মঠ বানাইছ। পিতলা ঘটিতে ভস্মও আছে। যাইবেন হেই আনে।


মাটিতে বসে পড়ে অনিন্দিতা। ওর চারপাশে স্তব্ধ হয়ে যায়, গাছের পাখিও যেন শিষ দিতে ভুলে যায়।


আমি স্কুলটা দেখতে চাই, চল।


স্কুল ভবনের গা ঘেষে দাঁড়ায় অনিন্দিতা স্থাপনের সনের দিকে চোখ যায় সচেতন ভাবেই। মা এদেশ ছেড়ে চলে যাবার সনই লেখা আছে। সত্যিই স্নেহময় পিতা মদন রায়। দাদু মশায়ের কথা মনে পড়তেই মনে হয় ও যেন অনেকক্ষণ আগে আমলকি চিবিয়ে ছিল। এখন পানি গিলছে।


ওর বুকে বড়সড় প্লাবন টের পায়। ঝাপসা দৃষ্টিতে দেখে স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে সবুজ সালোয়ার কামিজ পরা এক ছাত্রী। মেয়েটির ধর্ম বোঝা যাচ্ছে না।


স্কুলতো ছুটি হয়েছে কথা অনেক আগেই। এই নির্জন স্কুলে মেয়েটি একা দাঁড়িয়ে আছে কেন? মেয়েটির গায়ের রঙ এতো ফর্সা কেন? ঠিক যেন সাদা পরী!


অনিন্দিতা যেন টাইম মেশিনে অতীতমুখী যাত্রা করেছে। প্রতি দশ বছর পর পর ষ্টেশন। প্রতিটি ষ্টেশনেই টাইম মেশিন যাত্রাবিরতী করছে। প্রতিটি ষ্টেশনই খুব চেনা ওর। এক ষ্টেশনেই ও জানতে পারে আসমার জসিম কাকুর নিখোঁজ হবার কারণ, যেটা এই দেশের কেউ জানে না। জানবেও না কখনো।


অনিন্দিতার খুব চেনা এক ষ্টেশনে টাইম মেশিন যাত্রার সমাপ্তি দেয়। এই ষ্টেশনে টাইম মেশিনে বসেই মেয়েটিকে চিনে ফেলে। খিল খিল করে হাঁসছে মেয়েটি। মেয়েটির চোখের দৃষ্টি এতো প্রখর কেন?


: ঢাকা ফিরতে কিন্তু সন্ধ্যা হয়ে যাবে পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন আবদুর রব।


Powered by Blogger.

আসুন করনা সম্পর্কে সচেতন হই সুস্থ থাকি ।