দ্বীন সর্বদা একছিল এবং জাতীসমূহের প্রকৃতি আর স্বভাব অনুসারে শরীয়তের বিধানবলী অবতীর্ন হতে থাকে
সুধীমন্ডলী ও প্রিয় ভাইয়েরা।
দ্বীন আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে একটিই অবতীর্ন হয়েছে যা হযরত আদম (আঃ) থেকে শুরু হয়ে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত এসে শেষ হয়েছে। সকল আম্বিয়ায়ে কিরামের দ্বীন একই ছিল অবশ্য শরীয়ত এর বিধানাবলীতে ভিন্নতা ছিল। প্রকৃত দ্বীনের মধ্যে মৌলিক বিষয়াবলি অন্তর্ভুক্ত থাকে যেমন আল্লাহর অস্তিত্ব, আল্লাহর একত্ববাদ বা তাওহীদ, নবুয়ত ও রিসালাত, কবরের জগত, হাশর, মিজান, পুল-সিরাত, বেহেস্ত, দোযখ। উল্লেখিত বিষয়গুলি সমস্ত নবীদেরকে দেয়া হয়েছিল যা বুনিয়াদী উসুল বা নিয়ম। তারপা শরীয়তের বিধিবিধান আমলী প্রোগ্রাম যে গুলো ঐ সমস্ত নিয় অধীনস্ত। বিভিন্ন সম্পদায় আর জাতী সমূহের মেজাজ ও প্রকৃতি এবং মানসিক ভাবে গ্রহনযোগ্য-তার প্রেক্ষাপটে ভিন্ন ভিন্ন ছিল। যে-রূপ প্রয়োজন হয়েছে অনুরূপ আমল তাদেরকে দেয়া হয়েছে।
যদি কোন সম্প্রাদায় কঠোর মন-মানসিকতা সম্পন্ন হয় তবে শরীয়ত এর বিধি বিধানও কঠোর প্রকৃতিরই অবতীর্ন হয়। আর যদি কোন জাতীর মন-মানসিকতা কোমল প্রকৃতির হয় তবে বিধি নিষেধও নরম রাখা হয়। আর মধ্যম প্রকৃতির হলে নির্দেশাবলীও মধ্যম পন্থায় রাখা হতো। মোট কথা আমলী নির্দেশাবলীকে আল্লাহতায়ালা বিভিন্নজাতীর প্রকৃতি ও ধরন আর মন-মানসিকতা অনুসারে অবতরন করেন। এ কথাটিকেই নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক হাদীসে বর্ণনা করেন:
ابوانا واحد و امها تناشتی
অর্থাৎ আমাদের পিতা একজন আর মায়েরা হলেন ভিন্ন ভিন্ন। পিতাবলে এখানে মৌলের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে অর্থাৎ দ্বীন সবার একই আর মায়েদের দ্বারা এখানে আমলি নির্দেশাবলীর দিকে ইশারা করা হয়েছে।
শরীয়ত হলো ভিন্ন ভিন্ন এজন্যে প্রত্যেক নবীর যুগে শরীয়ত সমূহের মাঝে ভিন্নতা রয়েছে। দৃষ্টান্ত সরূপ হযরত আদম (আঃ) এর যুগের কথা ধরা যাক, ঐ সময়কে এমন মনে করা হতো যে তাহলো ইহ লৌকিক জগতের জন্য শিশুকাল সরূপ। যেন পার্থিব জগতটা একটি সন্তান তুল্য পরিবর্তীতে সে যৌবন প্রাপ্ত হয় এবং বৃদ্ধ হয়। ঐ যুগের বিধি নিষেধ খুবই হালকা ছিল:
وعلم ادم الاسمأكلها
বস্তু সমূহের নাম স্মরন করিয়ে দেয়া হয়েছে, যে রূপ আপনারা শিশুদেরকে প্রাথমিক ভাবে স্মরন করিয়ে দিয়ে থাকেন যে এটা হলো আকাশ, এটা ভূমি, এটা রুটি, এটা একটি পাত্র ইত্যাদি আমলি পর্যায়ে শুধু আল্লাহ তায়ালার কিছু নাম স্মরন করিয়ে দেওয়া হয়েছে যা সকাল সন্ধায় বলবে আর মানুষও তাই আমল করতো। সুতরাং ইহলৌকিক জীবনটা সম্পূর্ন আড়ম্বরহীন ছিল যেরূপ শিশু দের মন-মানসিকতা হয়ে থাকে। তাই বিধি নিষেধও প্রায় প্রাথমিক পর্যায়েরই ছিল এটা পূর্নাঙ্গ বিধান ছিলনা যা পরবর্তী শরীয়ত গুলোতে প্রবর্তন করা হয়েছে।
হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর যুগ আসলো। সে সময়ে মানুষ জ্যোতি বিদ্যার প্রতি আকৃষ্ট হয়। তারা চন্দ্র, সূর্যের উপাশনা করতো, আর নক্ষত্ররাজী দ্বারা ভাল মন্দের বিচার করতো হযরত ইব্রহীম (আঃ) ঐ যুগের প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে আল্লাহরঅস্তিত্ব আর একত্ববাদকে বুঝিয়েছেন, যার উল্লেখ কুরানেপাকে করা হয়েছে:
واذ قال ابراهيم لابیه از راتخذ اصنا ما اله اني أراك وقومك في ضلال مبين - وكذالك نزكى ليهم بسكون السموات والارض وليكون من الموقنين
হযরত ইব্রাহীম (আঃ)কে নক্ষত্ররাজী ও নভোমন্ডলের স্বরূপ বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে, আর তিনি সে অনুযায়ী জাতীর ইছলাহ বা শুদ্ধি করেছেন। এবং তারই অনুকূলে বিধি বিধান দেয়া হয়েছিল। হযরত মুছা (আঃ) এর যুগ এলো। ইহুদী-দের মন-মানসিকতা খুবই কঠোর ছিল। প্রথম থেকেই এই সম্প্রদায় যে অত্যন্ত রূঢ় ও কঠিন স্বভাবের তা প্রতিয়মান হয়। তাদের মধ্যে অহংকার আর গর্ব ছিল। সে যাই হোক তারা নবীদের সন্তান ছিল। এমনিতেই বুজুর্গদের সন্তানদের মাঝে বংশের কিছু অহংকার বোধ থাকে।
এ জন্য তারা বলতোঃ
نحن ابناؤ الله واحباه
আল্লাহ তায়ালার সাথে আমাদের আত্মীয় সম্পর্ক বিরাজমান এ জন্যইতো আমরা নবীদের সন্তান।
আসলে তারা খুব শিগ্রই কিছু মেনে নেওয়ার মত লোক ছিল না। সে কারণেই তারা নবীদের সাথে মোকাবেলা করতো। কতেক নবীকে তারা অস্বীকার করেছে, কাফের বলেছে, আর কতেককে হত্যা করেছে। এমন ধরনের ধৃষ্টতা দেখাতো যে- যখন কোন বিধি নিষেধ অবতীর্ন হতো আর অমনি বিরূধিতায় নেমে পড়তো তা আর মেনে নিতনা। আর যে কারনে শরীয়তও কঠোর প্রকৃতির অবতীর্ন হয়। যদি কেউ গাভীর বাচ্চার পুজা করে থাকে তবে আদেশ হতো তোমরা একে অপরকে হত্যা কর। তখন তার। পিতা ছেলেকে, ছেলে পিতাকে এমনি ভাবে পরস্পর পরস্পরকে হত্যা করেছে। শত শত মানুষ নিহত হয়েছে।
কোন কোন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে তাহারা রাতের বেলা যে সমস্ত আমল করতো প্রত্যুষে তা তাদের দরজা সমূহে লিপিবদ্ধ থাকতো যেন ইহজগতেই তাদেরকে অপমানিত করা হতো। এমন কঠোর বিধি নিষেধ আরোপ করা হয়েছিল যে-যদি কাপড়ে কোন অপবিত্র বস্তু লেগে যেত তবে তা পানির সাহায্যে পবিত্র হতো না বরং অপবিত্র স্থানটুকু কেচি দ্বারা কেটে ফেলা হতো। এমনকি যদি শরীরেও কোন নাপাকী লেগে যায় সেটাও পানির সাহায্যে পবিত্রতা হাছিল করা যেত না যতক্ষন পর্যন্ত শরীরের চামড়া কে ছিলা না হয়। সেই জাতীর স্বভাব আর মানসীকতা কঠিন থাকার কারনে তাদের জন্য শরীয়তের বিধানাবলীকেও এত কঠোর করা হয়েছিল।
হযরত ঈসা (আঃ) এর যুগ আসলো তাদের যুগটি ইতিপূর্বে-কার যুগের বিপরীত ছিল। তাদের মেজাজ ও স্বভাব অত্যন্ত কোমল ছিল তাই তাদের বিধানাবলীও খুব সহজ ছিল। যেমন তাদের বলা হয়েছে যে যদি কেউ তোমাদের একজনের গালে চপেটাঘাত করে তাহলে তোমার বাম গালটিও চপেটঘাতের জন্য পেতে দিও এবং তার জন্য এই দোয়াও করো যে-আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন। মোট কথা তাদের বিধান মতে প্রতিশোধ নেয়া নিষেধ ছিল, আর ইহুদী বিধান মতে প্রতিশোধ গ্রহন করা ওয়াজীব বা আবশ্যক, যেমন বলা হয়েছে যদি কেউ তোমার দাত ভাঙ্গে তুমিও তার দাত ভেঙ্গে দেয়া তোমার অবশ্য কর্তব্য। যদি কেউ তোমর চক্ষু তুলে ফেলে তুমিও তার চোখ তুলে ফেলা তোমার জন্য অবশ্য কর্তব্য।
وكتبنا عليهم فيها ان النفس بالنفس والعين بالعين والانف با الانف والاذن بالاذن والسن بالسن والجروح قصاص
