২য় দিনের তা'লীম | সিয়ামের ফযিলতের বর্ণনা
المجلس الثاني
দ্বীনি ভাইয়েরা। নিশ্চয়ই সিয়াম হচ্ছে অন্যতম উত্তম ইবাদত ও মহান পুণ্যকর্ম। বিভিন্ন আয়াত ও হাদীসে এর ফযিলত বর্ণিত আছে। আপনাদেরকে নেক আমলে উৎসাহিত করার জন্য তা থেকে কিছু উদ্ধৃত করা হল।
সিয়াম পালনের অন্যতম ফযিলত হল:
১. আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক উম্মতের উপর সিয়াম পালন ফরজ করেছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ
تَتَّقُوْنَ. (البقرة: ۱۸۳)
অর্থঃ হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেমনি ফরজ করা হয়েছিল পূর্ববর্তী উম্মতদের উপর, যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পারো।
(বাকারা: ১৮৩)
যদি সিয়াম বড় ধরণের ইবাদত না হত, তাহলে আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম হিসেবে তা পালনে এভাবে উদ্বুদ্ধ করা হত না এবং পূর্ববর্তী উম্মতের উপরও ফরজ করা হত না।
২. সিয়াম সাধনা মানুষের পাপ মোচনের একটি উত্তম মাধ্যম।
রাসূল (সা:) বলেন:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: مَنْ صَامَ رَمَضَانَ
إِيْمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَلبه. (متفق عليه)
অর্থঃ আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত, নবী করীম (স.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহতেসাবের সাথে (সাওয়াবের আশায়) সিয়াম পালন করবে, তার পূর্ববর্তী
পাপ ক্ষমা করে দেয়া হবে। (বুখারী ও মুসলিম) অর্থাৎ আল্লাহর উপর ঈমান ও সিয়াম ফরজ হওয়াকে সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করার সাথে সাথে সিয়ামের প্রতিদান প্রাপ্তির আশায়, এ বিধান পালন করলেই কেবল এ ফযিলত পাওয়া যাবে। সিয়াম ফরজ হওয়াতে বিরক্তি বোধ করবে না এবং সিয়ামের পুরস্কারের ব্যাপারে কোনরূপ সন্দেহ পোষণ করবে না। এভাবে সিয়াম পালন করলেই আল্লাহ তাআলা অতীতের পাপসমূহ মার্জনা করে দিবেন।
রাসূল (সা:) বলেন:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : الصَّلَوَاتُ الْخَمْسُ وَالْجُمْعَةُ إِلَى الْجُمُعَةِ وَرَمَضَانُ إِلَى رَمَضَانَ مُكَفِّرَاتٌ مَّا بَيْنَهُنَّ إِذَا اجْتَبَ الْكَبَائِرُ (مسلم)
অর্থঃ আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেন, পাঁচ ওয়াক্তের সালাত, এক জুমআ' হতে অন্য জুমআ'র সালাত এবং এক রমযান হতে অন্য রমযানের সিয়াম মধ্যবর্তী সময়ের সকল অপরাধের কাফফারা স্বরূপ, যদি কবীরা
গুনাহ হতে বিরত থাকে। (মুসলিম)
৩। সিয়াম পালনকারীকে সীমাহীন প্রতিদান দেয়া হবে।
হাদীসে বর্ণিত আছে:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: كُلُّ عَمَل ابْنِ آدَمَ لَهُ إِلَّا الصَّوْمَ فَإِنَّهُ لِي، وَأَنَا أَجْرِى بِهِ، وَالصَّيَامُ جُنَّةً فَإِذَا كَانَ يَوْمُ صَوْمِ أَحَدِكُمْ فَلَا
يَرْقَتْ وَلَا يَصْحَبُ فَإِنْ سَابُهُ أَحَدٌ أَوْ قَاتَلَهُ فَلْيَقُلْ إِنِّي صَائِمٌ (متفق عليه)
অর্থঃ আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, আল্লাহ বলেন, সিয়াম ছাড়া আদম সন্তানের প্রত্যেক আমল তার নিজের জন্য, কিন্তু সিয়াম আমার জন্য, আমিই এর প্রতিদান দিব। সিয়াম ঢালস্বরূপ। যদি তোমাদের কেউ সিয়াম পালন করে, তাহলে সে যেন অশ্লীল কথা না বলে, যদি কেউ তাকে গালি দেয় অথবা তার সাথে দ্বন্দে লিপ্ত হয়, তবে সে যেন বলে আমি সিয়াম পালনকারী। (বুখারী ও মুসলিম)
ঐ সত্তার শপথ, যার হাতে আমি মুহাম্মদ (সা.) এর জীবন, নিশ্চয়ই সিয়াম পালনকারীর মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহর নিকট মেক আম্বরের চেয়েও অধিক প্রিয়।
তিনি আরো বলেন, সিয়াম পালনকারীর জন্য দু'টি খুশি রয়েছে। একটি যখন সে ইফতার করে এবং দ্বিতীয়টি যখন সে তার প্রভূর সান্নিধ্য লাভে ধন্য হয়।
অপর বর্ণনায় পাওয়া যায়, আদম সন্তানের প্রতিটি আমলের প্রতিদান আল্লাহ তাআলা দশগুণ থেকে সাত শত গুণ পর্যন্ত বর্ধিত করে থাকেন। তবে সিয়াম সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, নিশ্চয়ই সিয়াম শুধুমাত্র আমারই জন্য, আমিই এর প্রতিদান দিব। কেননা, সিয়াম পালনকারী একমাত্র আমার জন্যই তার যৌন কামনা এবং খাদ্য গ্রহণ পরিত্যাগ করে।
সিয়ামের ফযিলত কয়েকভাবে প্রমাণিত হয়।
প্রথমত: আল্লাহ তাআলা সকল আমলের মধ্যে সিয়ামকেই বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। এখানে বান্দা ও তার প্রভূর মধ্যে প্রেমের এক গোপন বন্ধন রয়েছে, যে ব্যাপারে একমাত্র আল্লাহই অবগত। কেননা, সিয়াম পালনকারী সারা দিন লোক চক্ষুর অগোচরে নিরিবিলি স্থানে পানাহারের করার সুযোগ পায়, কিন্তু সে তা করে না। সে আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করে যে, সিয়াম ভঙ্গের মত কোন কিছু করলে কেউ না দেখলেও আল্লাহ দেখেন। সিয়াম পালনকারী আল্লাহর শাস্তি থেকে বেঁচে থাকা ও পূণ্য লাভের আশায় এগুলি পরিত্যাগ করে। এজন্যই আল্লাহ বলেন, বান্দা যৌনাচার ও পানাহার একমাত্র আমারই জন্য পরিত্যাগ করে থাকে।
দ্বিতীয়ত: আল্লাহ তাআলা সিয়ামের পুরস্কার প্রদান সম্পর্কে বলেন, وان أجزي به "সিয়ামের প্রতিদান আমি নিজে দিব"। তিনি সিয়ামের প্রতিদান প্রদানের অধিকার নিজের কাছে রেখেছেন। কেননা সমস্ত নেক আমলের সাওয়াব দশ থেকে সাতশত গুণ পর্যন্ত ফেরেশতাদের মাধ্যমে বৃদ্ধি করে থাকেন। কিন্তু সিয়ামের প্রতিদান অসংখ্য হারে বৃদ্ধি করে দিবেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّمَا يُوَفِّى الصَّابِرُوْنَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ (الزمر: (۱۰)
১০) অর্থঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা ধৈর্যশীলদের অসংখ্য প্রতিদান দিবেন। (যুমার: তৃতীয়ত: সিয়াম হলো ঢালস্বরূপ। অর্থাৎ সিয়াম অনর্থক কথা-বার্তা ও অশালীন কাজ হতে বাঁচিয়ে রাখে।
অনুরূপভাবে সিয়াম জাহান্নাম হতে বাঁচায়। ইমাম আহমদ (র:) জাবির
(রা:) হতে বর্ণনা করেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, 'সিয়াম ঢালস্বরূপ। যার দ্বারা সিয়াম পালনকারী নিজেকে জাহান্নাম হতে বাঁচাতে পারে'।
চতুর্থত: সিয়াম পালনকারীর মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশকের সুগন্ধি হতেও প্রিয়। এতে প্রমাণিত হয়, সিয়ামের মর্যাদা আল্লাহর নিকট অনেক বেশী।
পঞ্চমত: সিয়াম পালনকারীর জন্য দু'টি খুশি রয়েছেঃ প্রথমটি ইফতারের সময়। দ্বিতীয়টি রবের সাথে সাক্ষাতের সময়। ইফতারের সময় খুশি হচ্ছে: আল্লাহ তাআলা তাকে সিয়ামের মত একটি উত্তম ইবাদত করার সুযোগ দিয়েছেন এবং আল্লাহ তাআলা তার জন্য পানাহার ও স্ত্রী মিলন হালাল করেছেন, যা সিয়াম অবস্থায় হারাম ছিল। প্রভুর সাথে সাক্ষাতের খুশি হচ্ছে: আল্লাহ তাআলা তাকে সেদিন পরিপূর্ণ প্রতিদান দিবেন, যেদিন নেকীর বিশেষ প্রয়োজন হবে। আল্লাহ কিয়ামতের দিন ঘোষণা দিবেন, কোথায় সিয়াম পালনকারীগণ? তোমরা রাইয়্যান নামক দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ কর, যে দরজা দিয়ে সিয়াম পালনকারী ছাড়া অন্য কেউ প্রবেশ করবে না।
ষষ্ঠত: সিয়ামের অন্যতম ফযিলত হল: সিয়াম তার আদায়কারীর জন্য কিয়ামতের দিন সুপারিশ করবে।
রাসূল (স.) ইরশাদ করেন:
الصِّيَامُ وَالْقُرْآنُ يَشْفَعَانِ لِلْعَبْدِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَقُوْلُ الصِّيَامُ أَي رَبِّ مَنَعَتَهُ الطَّعَامَ وَالشَّهْوَاتِ بِالنَّهَارِ فَشَفَعْنِي فِيهِ، وَيَقُولُ الْقُرْآنُ مَنَعْتُهُ النَّوْمَ بِاللَّيْلِ فَشَفَعْنِي فِيْهِ قَالَ فَيُسْفَعَانِ
(أحمد)
অর্থঃ সিয়াম ও কুরআন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। সিয়াম বলবে, হে আল্লাহ! আমি তাকে পানাহার ও যৌনাচার হতে বিরত রেখেছি। সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন।
কুরআন বলবে, হে আল্লাহ! আমি রাতের ঘুম থেকে বান্দাকে বিরত রেখেছি, সুতরাং আমার সুপারিশ কবুল করুন। তাদের উভয়ের সুপারিশ কবুল করা হবে।
প্রিয় পাঠক! সিয়ামের উল্লিখিত ফযিলত, ঐ ব্যক্তির জন্য, যে যত্ন ও আদবের সাথে সিয়াম পালন করে। সুতরাং আমাদের উচিৎ সিয়াম যথাযথ আদবের সাথে পালন করা। হে আল্লাহ! আপনি আমাদের সিয়াম কবুল করুন, সুপারিশকারী হিসাবে গ্রহণ করুন এবং আমাদের পিতা-মাতা ও মুসলিম উম্মাহকে ক্ষমা করুন।
নবী (সা:), তাঁর পরিবার ও সাহাবীদের উপর শান্তি বর্ষণ করুন।
سُبحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ أَشْهَدُ أَنْ لا إلهَ إِلَّا أَنْتَ اسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إِلَيْكَ.
