পূর্ব কথা
॥ এক ॥
বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য টাঙ্গাইল জেলার মধ্যে ভূঞাপুর উপজেলার নাম নানা কারণে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে আসছে। ভূঞাপুর এই নামের মধ্যে রয়েছে এর ইতিহাস। এখানেই বাংলার জমিদার বারো ভূঁইয়াদের মধ্যে প্রবল প্রতাপশালী নেতা মসলদ-ই-আলা ঈসা খাঁ মুঘল সম্রাট আকবরের সেনাপতি মানসিংহের সঙ্গে যুদ্ধ করে তাঁর তরবারী ভেঙে দিয়েছিলেন। এখানে যমুনার শাখা নদী লৌহজঙ্গের তীরে ঈশা খাঁ নৌবহর গড়ে তুলে মগ হামাদ ও ফিরিঙ্গী জলে দস্যু তস্করদের অত্যাচার থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করে ছিলেন।
এই ভূঞাপুর নামটি সেই ভূঁইয়াদের এখানে অবস্থানের কারণেই হয়েছে। ১৫০০ সালের শেষের দিকে এখানে ভূঁইয়ারা বাস করতেন। প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, এখানে ভূঁইয়াদের সর্দার ঈশা খাঁর ছিল একটি শক্তিশালী সেনা ঘটি। এই লৌহজঙ্গ নদীর কূলে মানসিংহ ও ঈশা খাঁ এর সেনাবাহিনীর একটি খণ্ড যুদ্ধ হয়েছিল। এখানে ভূঞাপুরে সেই ভূঁইয়ারা নেই নামটি হয়েছে বিকৃত। আসলে ভূঞাপুরের আছে ঐতিহ্য আছে গৌরবময় ইতিহাস।
এই ভূঞাপুরে উপমহাদেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সুসাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, সমাজ সেবক এবং বহু গ্রন্থ প্রনেতা প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি এ দেশের গৌরব। তাঁর কর্মস্থল এই ভূঞাপুর। এখানে রয়েছে তাঁর অসংখ্য কীর্তি, এখানে রয়েছে তার মাজার। তাঁর কীর্তি শুধু ভূঞাপুর করটিয়া, টাঙ্গাইল নয়, ছড়িয়ে রয়েছে সারা বাংলাদেশে। আধুনিক ভূঞাপুরের রুপকার প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ হলেও তাঁর হাতে গড়া তিলে তিলে তিলোত্তমা ভূঞাপুর হলেও, ইবরাহীম খাঁর জন্মের চল্লিশ বছর পূর্বে এখানে যিনি জন্ম গ্রহণ করে প্রথম স্কুল, মাদ্রাসা, মকতব স্থাপন করে আলোর মশাল জ্বেলে ছিলেন, ক্লাব গঠন করে গ্রামে গ্রামে ঘুরে সভা করে বক্তৃতা দিয়ে ঘুমন্ত অশিক্ষিত জনসাধারণকে জাগিয়ে তুলেছিলেন, চিকিৎসা সেবা দিয়ে রুগ্ন দুর্বলদের সুস্থ্য সবল করে তুলেছিলেন আশার বাণী শুনিয়ে হতাশা প্রাণে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছিলেন তিনি মওলানা দরবেশ আহমদ।
এই সেই ভূঞাপুর, যেখানে ৭১ এর স্বাধীনাতায় বাংলার অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধা বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী মুক্তিযুদ্ধের দুর্জয় ঘাঁটি গড়ে তুলেছিলেন। দেশ থেকে হানাদারদের তাড়ানোর অনেক আগেই ভূঞাপুর হানাদর মুক্ত করে স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়িয়ে ছিলেন। এই ভূঞাপুরের মাটিতে আছে অনেক অনেক গৌরব গাঁথা।
॥ দুই ॥
আধুনিক ভূঞাপুরের রূপকার প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁর জন্মের ৪০ বছর পূর্বে ১৮৫৫ সালে জন্ম গ্রহণ করেন মওলানা দরবেশ আহমদ। তিনি শিক্ষাদীক্ষা হীন অর্থনীতিতে ভেঙে পড়া দরিদ্র অসহায় মুসলমানদের জন্য স্কুল, মকতব, মাদরাসা স্থাপন করে সর্বপ্রথম শিক্ষার আলো জ্বেলে ছিলেন। ক্লাব গঠন করে, কমিটি করে, গ্রামে গ্রামে ঘুরে বক্তৃতা দিয়ে, চিকিৎসা সেবা দিয়ে, সমাজের কুসংস্কার দূর করে, ইসলাম প্রচার করে, অন্যায় অনাচার মিথ্যার প্রাতিবাদে রাজনীতি করে এই বিস্তৃর্ণ এলাকায় একা নির্জীব মানুষের প্রাণে চেতনার সঞ্চার করেছিলেন এবং জাতীয় জীবনে জাগরণ এনে ছিলেন যিনি, তিনি মওলানা দরবেশ আহমদ। তিনি পরাধীন দেশে সম্পূর্ণ প্রতিক্ল পরিবেশে কি ভাবে কি কাজ করে ছিলেন তা জানার আগে সে কালের দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা জানতে হবে।
