তৎকালে বাংলার মুসলমানদের অবস্থা
তৎকালে বাংলার মুসলমানদের অবস্থা
তৎকালে বাংলার মুসলমানরা শুধু কৃষকই ছিলেন। তাদের রুজি-রোজগারের জন্য চাকরি ও ব্যবসা বাণিজ্য কিছুই ছিল না। বিশাল জনগোষ্ঠি ছিল বেকার। তারা হিন্দু জমিদার ও মহাজন দ্বারা শোষিত ও নির্যাতিত ছিল। একদিকে শিক্ষাহীন অন্যদিকে অর্থহীন হয়ে ভীষণভাবে দুর্বল ও অসহায় হয়ে পড়েছিল। মুসলমানদের সেই সময়ের করুন অবস্থার কিছুটা বর্ণনা পাওয়া যায় প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁর বিখ্যাত 'বাতায়ন' গ্রন্থে তিনি লিখেছেন:
'তৎকালে বাংলার মুসলমান কোথাও খোঁজ করতে হলে হালক্ষেতের পর যেতে হতো জেলখানায়, ফৌজদারী এজলাসে, আদালতের পিওন চাপরাশী মহলে, জমিদারের পাইক পিয়াদার আড্ডায় আর রেলস্টেশনে, যেখানে দেখা যেতো মহাজন দিয়ে উৎখাত হওয়া শ শ নিঃস্ব চাষী ছেঁড়া কাঁথা, ভাঙ্গা চাটাই, নেংটা ছেলেপুলে আর হাহাকারে ফেটে পড়া মা, স্ত্রী, কন্যা নিয়ে আসামের জঙ্গল পানে চলছে'। তিনি আরো বলেছেন:
আসাম যাত্রীর কাঁন্না আমার কান নিশ্চিত রকমে চিনে ফেলেছিল, ও কাঁন্নার আওয়াজে আমার বুকে জানি কেমন তোলপাড় করে উঠত। শ্রাবণ মাস, একদিন করটিয়া বাসায় বসে আছি খালের পাড় থেকে ভেসে এল নারী কন্ঠের কাঁন্না। তীরের মত কলিজার বোটায় গিয়ে বিঁধল সে হৃদয়ভেদী আর্তনাদ। চাকরকে বললাম দেখে আয়তো রে, আসাম যাত্রী নাকি? সে ফিরে এসে বলল, তাই জাহাজ ঘাটে যাওয়ার জন্য ওরা নৌকায় উঠেছে।
আবার দেখেছি এদের, পাকিস্তান হওয়ার পর। জঙ্গল কেটে, বাঘ মেরে, সাপ তাড়িয়ে আসামের বনকে যারা বাগানে পরিণত করেছে, তদেরকে উগ্র উৎক্ষিপ্ত হিন্দু জাতীয়তা নির্মম ভাবে তাড়িয়ে দিয়েছে। দলে দলে তারা তাদের পুরান দেশে ছুটছে। চিন্তায় ক্ষুধায়-ক্লান্তিতে কতজন পথে ঢলে পড়েছে, কতজন রেল স্টেশনে এসে ভিড় করেছে রাতে শুয়েছে, ভোরে আর দেখা মেলে নাই। বাকীরা এসে তাদের পিতা-পিতামহের গায় ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের পেটে দারুণ ক্ষুধা, তাদের বুকে দারুণ ব্যথা, তাদের চোখে নিদারুণ নিরাশা। (আসাম যাত্রী, বাতায়ন)।
মাসিক মদীনা সম্পাদক মওলানা মুহিউদ্দীন খান তাঁর আত্মজীবনী গ্রন্থে 'জীবনের খেলাঘরে'-এ লিখেছেন:
কৈশোরের যে মর্মস্পর্শী স্মৃতিটুকু আমি এখনও ভুলতে পারিনি, তা হলো, আমাদের দুর্ভিক্ষ-পীড়িত অসহায় কৃষক পরিবারগুলোর ভিটামাটি বিক্রি করে দলে দলে দেশত্যাগের দৃশ্য। বাড়ীর পাশে জেলা বোর্ডের প্রাচীন সড়ক পথে প্রায় প্রতিদিই দেখা মিলতো জীবিত কংকালসম সেই মানুষ গুলির চলন্ত কাফেলা। কখনো গরুর গাড়ী বোঝাই হয়ে, কখনো ময়লা জীর্ন কাঁথা বালিস মাথায় নিয়ে পাঁয়ে হেঁটে অনিশ্চিত
যাত্রাপথে অগ্রসর হতো সেই কাফেলা গুলি। মেয়েরা বিলাপ করতো। বয়স্করা নীরবে চোখ মুছতে মুছতে অগ্রসর হতো। আমার বয়সী ছেলেমেয়েরা ভাবলেশহীন চোখে তাকিয়ে থাকতো। আমার তখন মনে হতো ওদের সেই বেদনা ভারা ক্লান্ত দুটি চোখ আমাকেই যেনো ডেকে বলছে, তোমরা কি পার না এই পরিচিত সমাজ পরিবেশের মধ্যেই আমাদের জন্য একটু আশ্রয় আর দিনান্তে দু'মুঠো ভাতের ব্যবস্থা করতে? আমি আর ভাবতে পারতাম না ভিতর থেকে উথলিত হয়ে আসা কান্নায় যেনো বুক ভারী হয়ে যেতো। মন বলতো, ওদের ডেকে ফিরাই। গ্রামের বড় বড় টিনের ঘরওয়ালা বাড়ি গুলিতে ওদের নিয়ে উঠিয়ে দেই। (জীবনের খেলাঘরে, পৃষ্ঠা: ১৫-১৬)। তৎকালে মুসলমান কৃষকদের অবস্থা সম্পর্কে নিরোদ সি-চৌধুরী নামে এক ভদ্রলোক ইংরেজি ভাষায় রচিত তাঁর আত্মজীবনী গ্রন্থে লিখেছেন যে, মুসলমান কৃষকদের আমরা হালের গরুর চাইতে উন্নত কোন জীব বলে মনে করতাম না।' এমনি করুণ অবস্থা ছিল বাংলার মুসলমান কৃষকদের।
