আলিম সমাজের সামাজিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রম
আলিম সমাজের সামাজিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রম
সবাই জানেন, বাংলার মুসলিম জনসাধারন ধর্মভীরু। আলিম সমাজের প্রতি তাদের শ্রদ্ধাবোধ ছিল যুগে যুগে, আর আজো তা অটুট রয়েছে। তারা ধর্মক্ষেত্রে, রাজনীতির মঞ্চে, শিক্ষা, সংস্কৃতির অঙ্গনে আলিমদের উপদেশ নিষেধ মেনে চলার চেষ্টা করেছেন, তাদের চিন্তা চেতনায় প্রভাবান্বিত হয়েছেন। আলিম সমাজের বিশেষ একটি অংশ কালে কালে ধর্মক্ষেত্রে যেমন দিশারীর ভূমিকা পালন করেছেন, তেমনি রাজনীতি আর সমাজ ক্ষেত্রেও নেতৃত্ব দিয়েছেন। তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকতে হবে, যারা কল্যাণের পথে ডাকবে (মানুষকে) এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখবে।' কুরআনের এই মর্মানুসারে তারা রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্রিয়া কর্মকে ধর্মীয় দায়িত্ব মনে করতেন এবং ধর্মীয় দায়িত্বের পাশাপাশি দেশের আইন প্রণয়ন, রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণ দলীয় ও নির্দলীয় রাজনৈতিক মতামত সৃজন আর শিক্ষা সংস্কৃতি বিকাশ সাধনে এ কান্ডারির ভূমিকা পালন করেন। সেকালের আলিম সমাজ ও বর্তমান কালের আলিম সমাজের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য দেখা যায়। সেকালে আলিম সমাজ ইসলাম ও রাজনীতির মধ্যে কোনো পার্থক্যর রেখা টানেননি। ধর্মীয় জীবন ও রাজনৈতিক জীবন তাদের কাছে ছিল একরূপ। তারা অনুসরণ করতেন আল-কুরআনের বিধি বিধান, রাসূল (সাঃ) এর আদর্শ এবং সাহাবীদের। আর বর্তমানের আলিমদের প্রায় সবাই ধর্ম থেকে রাজনীতিকে পৃথক করে সুবিধাবাদী নীতি অবলম্বন করে চলছেন। ধর্মকে তাঁরা পোষাকী জীবন ব্যবস্থা মনে করছেন। তারা 'মওলানা মুহাম্মদ' বলে দোয়া পড়ছেন,
নবী (সাঃ) এর দরুদ-মিলাদ পড়ে হাদিয়া পকেটে তুলছেন কিন্তু 'মওলানা' শব্দের অর্থ-তাৎপর্য উপলব্ধি করছেন না। বর্তমানের নতুন নতুন সমস্যা এবং দল উপদল তৈরি করছেন। এর ফলে মুসলিম সমাজের ঐক্য বিনষ্ট করেছেন।
ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, তৎকালে আলিম সমাজ বঙ্গবিভাগ আন্দোলন থেকে শুরু করে প্যান ইসলামী আন্দোলন, খিলাফত আন্দোলন, তানমীম ও তবলীগ আন্দোলন, কৃষক প্রজা আন্দোলন, আইন অমান্য আন্দোলন, পাকিস্তান আন্দোলন প্রত্যেকটিতেই
কম-বেশি অংশগ্রহণ করেছেন। লক্ষণীয়, খিলাফত আন্দোলনে আলিম সম্প্রদায় ধর্মীয় প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সর্বাধিক সংখ্যক এবং অনেকটা সর্বসম্মত ভাবেই বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছেন। এবং সমাজের অন্যান্য শ্রেণির তুলনায় তারা অধিকতর কারা নির্যাতন ভোগ করেছেন। বাংলার আলিম শ্রেণির রাজনৈতিক ইতিহাসে যথেষ্ট সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিলক্ষিত হয়। তাঁরা আনজুমান-ই-ওয়ায়েজিন, আনজুমান-এ-উলামা-এ-বাংলা, বংগীয় খিলাফত কমিটি, জমিয়ত-এ-উলামা বাংলা, জমিয়ত-এ-উলামা বাংলা ও আসাম ইত্যাদি গঠন করে ধর্ম প্রচারের পাশাপাশি রাজনৈতিক জনমত সৃষ্টির প্রয়াস পান।
আলিম সমাজ কেবল সাংগঠনিক রাজনীতি করে বা বক্তৃতা বিবৃতি দিয়েই ক্ষান্ত হননি, সাংবাদিকতা মাধ্যমেও তাঁরা ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক জনমত সৃষ্টির প্রয়াস পান। বিংশ শতক বাংলায় আলিমদের মধ্যে সাংবাদিকতার ময়দানে সর্ব প্রথম অবতীন হন যথাক্রমে মওলানা মনিরুজ্জামান এছলামাবাদী ও মওলানা হাকীম হাবীবুর রহমান। পীর মুর্শিদ শ্রেণির মধ্যে ইসলামি সাংবাদিকতার অঙ্গনে সবপ্রথম পদার্পণ করেন ফুরফুরার পীর মওলানা আবু বকর সিদ্দিকী (রাঃ)। মুসলিম বঙ্গে যাতে ইসলামী সাময়িকী প্রতিষ্ঠা ও প্রয়াস লাভ করে সেই উদ্দেশ্যে তিনি আজীবন প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। মোসলেম হিতৈষী, ইসলাম দর্শন, হানাফী, শরিয়ত, শারিয়তে ইসলাম, সুন্নত আল জামায়ত, হেদায়ত মোসলেম প্রভৃতি পত্রিকার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।
এগুলোর মধ্যে কয়েকটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি নিজেই। ইসলামী সাংবাদিকতার প্রাতি তাঁর এই পৃষ্টপোষকতা কেবল ধর্ম প্রচারেই সহায়তা করেনি, উলামা সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্মীয় সংস্কারের প্রেরণা, স্বজাত্যবোধ, সামাজিক ঐক্য এবং রাজনৈতিক চিন্তাচেতনা সৃষ্টিতে ও বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
এই দিক গুলোর নিরিখে নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, বাংলার ধর্ম প্রচার, রাজনৈতিক ক্রিয়াকর্ম, আইন প্রণয়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় আলিম সমাজের ও বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। বাংলার ইতিহাসে এই অধ্যায়টি এখনো অনেকটা অনালোচিত রয়ে গেছে। এর ফলে আলিম ও অ-আলিম প্রায় সবাই মনে করেন যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে আলিমদের কোনো ভূমিকা নেই।
