TjT

করনা প্রতিরোধে হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার মেনে চলুন। অপরিষ্কার হাত দিয়ে চোখ, নাক ও মুখ স্পর্শ্ করা থেকে বিরত থাকুন। অ্যালকোহল যুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার হাতের তালুতে নিয়ে ( 20 সেকেন্ড ) ভাল করে পরিষ্কার করুন। ব্যবহৃত টিস্যু ঢাকনা যুক্ত ডাস্টবিনে ফেলুন। পরিচিত বা অপরিচিত ব্যক্তির সাথে হাত মেলানো বা আলিঙ্গন করা থেকে বিরত থাকুন। আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকুন।

ডাঙ্গায় মাছ সাঁতার

যে রাতে এমন হয় সে রাতে ঘুমাতে পারে না। রাতের গাড়ি মধ্যগগনে স্থির হওয়ার সময়েই এ কাজটা হয়। তাই বাকি রাতটুকু অঘুমো। নির্ঘুম রাতটুকু দুঃসহ ভাবে পার করে বুঝতে পারে শরীর কতটা অসহায়।


এখন সারা এলাকা ঘুমে নিমগ্ন। পাশের ঘরে ক্লান্ত মাহাবুর অঘোরে ঘুমাচ্ছে। শুধু নেহালই নির্ঘুম, স্তব্ধ। প্রচন্ড তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে আসছে। ইচ্ছে করেই এতক্ষণ পানি খায়নি। কার উপর রাগ-অভিমান-জেদ দেখাচ্ছে জানে না। নিস্ফল রাগ-জেদ-অভিমান পড়ে যায়, তৃষ্ণা পূর্ণমাত্রায় জেগে ওঠে। ফ্রিজ থেকে এক বোতল ঠান্ডা পানি বের করে আনে। 'লালন মইলো জল পিপাসায় থাকতে নদী মেঘনা' লীলা বয়াতীর গানটা মনে পড়ল। না নেহাল জল তৃষ্ণায় মরবে না। আকণ্ঠ পান করে বোতলটা শূন্য করে ফেলে।


এ বাসাটা দু'রুমের। একটা রুম শৌখিন আসবাবপত্র দিয়ে সাজানো। রুমটা না বেডরুম না ড্রয়িং রুম, পরিস্কার বোঝার উপায় নেই। সোফা আছে একসেট। সিঙ্গেল খাট, তাতে নরম বিছানা পাতা। ড্রেসিং টেবিল, আলমিরা, শোকেস বুকসেলফ, কালার টিভি, মিউজিক সেন্টার, এক পাশের দেয়ালে নামি শিল্পীর দামি নৈসর্গিক দৃশ্য, অন্য পাশের দেয়ালে নদীতে নারীর স্নানের খোলামেলা দৃশ্য। ছবিটা কোনোমতেই অশ্লীল নয়, তবে ছবিটার দিকে তাকালেই মন কেমন করে ওঠে। একটু লজ্জা! একটু ভালোলাগা! মেঝেতে পুরু ইজিপশিয়ান কার্পেট। শোবার ঘরের অন্ত র্নিহিত বক্তব্য নিঃশব্দ এবং ঘুম, এর পুরোটাই আবার বসার ঘরের খোলামেলা ঠাণ্ডা নীল পরিবেশ পুরোটাই মেলে। অস্তত মাহবুব ভাইয়ের বন্ধুরা তেমনই বলে। ওর রুমটা ভেতরের দিকে ঘুমানোর জন্য খাট পাতা চারজনের খাবার টেবিল, কৌটো রাখার শেলফ, জ্বতোর আলনা, কাপড়ের আলনা, মাঝারি আকারে L.G ফ্রিজ, চালের ড্রাম, দু'রুমের মাঝখানে বাথরুম।


রাত গভীর অথবা একটু আগে পুরো বোতল পানি সাবড়ে দিয়েছে, যে কারণেই হোক নেহাল বেশ ভারী হয়েছে। বাথরুমে যেয়ে অনেকক্ষণ ধরে হালকা হয়, তারপরও ওর শরীরের কষ্ট যায় না। হায়রে পোড়া শরীর কখনও ভেজাতে গিয়ে শুষ্কতা কখনও নিজে ভিজে শুষ্ক! শরীরের কষ্ট ছাপিয়ে মন গ্লানিতে ভরে ওঠে।

বুয়ার কলিং বেলে নেহালই জাগে তেমনি কথা। বুয়াকে দরজা খুলে দিয়ে বাথরুমে ঢোকে। ডোভ সাওয়ার ক্রিম দিয়ে অনেকক্ষণ ধরে শরীর মাজে। মাহাবুব ভাই নিজের চেয়ে নেহালের প্রতি যত্নবান। দামি দামি বাথরুম সামগ্রী। মিররে নেহালের প্রতিবিম্ব ফুটে ওঠে। চমৎকার মুখচ্ছবি। একমাথা চুল। খয়েরি স্তনের বোঁটা। বোঁটার নিচেই লাল চাকা। জল শরীরে লাল পদ্মের মতো, নিজের অজান্তেই হাত বুলায় লাল দাগটায়। পিঠেও আছে এমন আরো দুটি, বুঝতে পারছে এগুলো মাহাবুব ভাইয়ের দাঁত আর ঠোটের কারুকাজ। বাথরুমের দরজায় টুকটুক আওয়াজ। মাহাবুব ভাইয়ের ওঠার সময় হয়ে গেছে। আজ কি নেহাল বেশি সময় নিয়ে ফেলল! রড থেকে তোয়ালে টেনে নেয়। লুঙ্গিটা কোনোমতে বেঁধেই দরজা খুলে দেয়।


নিজের ঘরে ঢুকে দেখে বুয়া রাতটা সরিয়ে ঝকঝকে সকাল এনে ফেলেছে। খাটে অলিভ ওয়েল, লোশন, গ্লিসারিন নিয়ে বসে। একটু সময় নিয়ে এগুলো মাখবে যাতে চামড়া টানটান ও নরম থাকে। খাটে বসেই বাইরের পৃথিবীর দিকে চোখ রাখে। দরজার মাপে আকাশে, ঐ মাপের পৃথিবীটা কি অমলিন। নির্মেয লাবণ্যময় আকাশ সুর্যের আলোতে গলা ছেড়ে গান গাইছে। এই রোদ, আকাশ, আলো, সবুজ বৃক্ষ কোথাও নেহালের বেদনা-বেহালার সুর ধরে নেই। নেচারাল কালার নেল পালিশ সমেত নখটার সাথে এই সময় কি চমৎকার মিলে যাচ্ছে।


বুয়া টেবিলে নাস্তা সাজায়। মাহবুব ভাই কোনোদিনই নেহালকে ছাড়া খাবার খায় না।' টেবিলে বসে প্রথম ডাকটা দেয় খুবই মেলোয়েম। যেমন প্রেমিক ডাকে প্রেমিকাকে। দ্বিতীয় ডাকটা ভয় ধরিয়ে দেয়। নেহাল কোনোদিনই দ্বিতীয় ডাকের অপেক্ষা করে না।


প্রতিটি খাবার নেহালের পাতে তুলে দেয়। টুকটুক কথাবার্তা ছাড়া খেতে পারে না মাহাবুব ভাই। ওদের কথা শুধু সকালে আর রাতের খাবারের টেবিলেই হয়।


: কখন যাচ্ছ?


: এই তো তৈরি হয়েই, প্রথমে কলেজ গেট তারপর অফিস।


: কি যেন হয়?


: গ্রাম সম্পর্কে ভাই।


: পাশের জেনারেল ষ্টোর থেকে কিছু খাবার-দাবার নিয়ে নিও। বলা আছে, গেলেই হবে।


বেরুবার মুখে আবার ডাক-


: যাচ্ছ?

পাঁচশত টাকার দুটো নোট এগিয়ে দেয়।


:


সি এনজি বা ক্যাব ধরে চলে যেও। নইলে অফিসে দেরি হবে।


দিনের আলোতে লোকটার দায়িত্ব পূর্ণমাত্রায় মেলে। অবিবাহিত মাহাবুব ভাই, ভাই-বোনদের পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালনে একনিষ্ঠ। নেহালকে বাড়াবাড়ি রকমের আদর-যত্ন করেন। এই যে ভালোভাবে থাকা, খাওয়া-চলাফেরা-সবই মাহাবুব ভাইয়ের জন্য। নইলে ওর মতো সহায় সম্বলহীন ছেলের আবার এত...।


গ্রামের স্কুল পাস দেবার পর অভাবের সংসারে লেখাপড়ার স্বপ্নটা বিলাস। ওদের অবস্থানের অনেক ছেলেই শারীরিক যোগ্যতায় বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনীতে যোগ দেয়। পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চির কাছাকাছি দৈর্ঘ্য, ফর্সা, লাবণ্যময় হাত-পা, মুখাবরন ওর মাঝে মেয়েলি ভাবটাই প্রকট।


রোজগারের ধান্ধায় রাজধানীতে আসে। পিয়ন-টিয়ন গোছের কিছু একটা হলেই চলবে। দুর সম্পর্কে এক আত্মীয়ের বাসায় থাকার পর ঐ আত্মীয়ই আশরাফ স্যারের অফিসে নিয়ে এলো। তিনি তার অফিসে ওকে নিয়োগ দেন। ষ্টাফ নেহাল একাই। দু'বেলা খাওয়া ও থাকা ছাড়া বেতন সর্বসাকুল্যে তিন হাজার টাকা। দুবেলা খাবারের রহস্য হলো স্যার দুপুরে অফিসেই খান। রাঁধতে হয় নেহালকেই। দুপুরের রান্নাতেই একটু বাড়তি চাল দিয়ে দেয়, ভাত যেটুকু বেঁচে যায়, সেটুকুই ওর রাতের খাবার। সকালে ঘুম থেকে জেগে চেয়ার-টেবিল ঝেড়েমুছে, ঘর-দুয়ার পরিস্কার করে গোসল সেরে কাপড়-চোপড় পরে বসে থাকে, দশটা নাগাদ স্যার অফিসে এলে তবে সামনের দোকান থেকে পাউরুটি কলা বা পরোটা ভাজি, এক কাপ চা-এর বিলেই বিশ টাকার নোটটা বের করে নেয়।


তিন মাস তিন হাজার থেকে নিজের বাবদ ছয়শত টাকা রেখে বাকি টাকা মাকে পাঠায়। শত অভাবের সংসার থেকে মা প্রায়ই বাবার অসুখ, দুই ভাইয়ের পড়ার খরচ, অবিবাহিত ছোটবোনের বিয়ের জোগাড়যন্ত্র, বড় বোনের শ্বশুরবাড়ির সামাজিকতার চাপ ইত্যাদির কথা জানায়। নেহাল জানে দরিদ্র স্রোতময় সংসারে ঐটুকু টাকা ছোট্ট একটা ভেলা মাত্র।


আশরাফ স্যারের ব্যবসা মুলত তদবির। অনেক ধরনের লোকজনের আনাগোনা, অনেক সময় বন্ধু-বান্ধবের আড্ডা। এই তদবিরবাজ আশরাফ স্যারের বন্ধুই হলো মাহাবুব ভাই, উনার বন্ধুরা বলে মাহবুবের শরীরের পুরোটাই দিল। সেটাও আবার খোলা। যখন তখন বন্ধুদের জন্য দামি খাবারের আয়োজন করে। অফিসে এলেই ঘণ্টায় ঘণ্টায় চা-সিংগাড়া আনতে হয় নেহালকে। মাহাবুব ভাই বড় নোটের ভাংতি কখনও ফেরত নেয় না।

একদিন চা পর্ব শেষ হবার পর এঁটো কাপগুলো আনছিল, দরজা পার হতেই কানে আসে-'আশরাফরে, এই মাকুন্দা হালারে জোটালি কোথথেকেরে? হালার গোয়ার সাইজটারে।'


পরিচ্ছন্ন ভব্য পোশাকের পুরুষ্ট পুরুষ কি করে এমন জঘন্য ইঙ্গিত করে, তাহলে সবাই কি! আশরাফ তো সম্পূর্ণ নিরাপদ, অন্তত এই তিন মাসে তেমনই বুঝেছে।


মাহাবুব ভাই মাঝে মাঝেই ওদের অফিসে আসে, সময়ে-অসময়ে চকচকে টাকা বকশিস দেয় আবার ভাংতি ফেরত না নেবার ব্যাপারটা তো রয়েই গেছে, এই দুর্মূল্যের বাজারে পূর্ণবয়স্ক কারো বেতন তিন হাজার টাকা হতে পারে, এটা নিয়েও আফসোস করে, এত কিছুর পরও নেহাল কিন্তু মাহাবুব ভাইকে এড়িয়েই চলে।


মাহাবুব ভাইয়ের উদ্যেগেই নেহালের মেঝেতে ঘুমানোর কাল শেষ হয়, চাকরি ঠিক রেখে অবস্থান বদল করে, কয়েকদিনেই নেহালের পোশাক-আশাক, চেহারা-সুরতের বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে। বেতনের সাথে সঙ্গতিহীন সোনার চেন আর মোবাইল সেটটার দিকে তাকিয়ে থাকে আশরাফ স্যার। গাম্ভীর্য ভেঙে কিছুই বলে না তবে ঠোট টিপে হাসে। এই হাসিটার সাথে ওদের গ্রামের পলাশ ভাইয়ের হাসিটার খুব মিল খায়।


বাউন্ডুলে বাবা একবার যদি ঘর থেকে বেরুত তবে ফেরার সময় আর বাঁধ মানত না। সকালে বাজার করে দিচ্ছি বলে সেই যে বের হয়ে যায়, দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যাটা ধরে ধরে অবস্থা, তবু ও বাবা নেই। সপ্তাহে একদিনই মাত্র হাট বসে, ধারেকাছে কোনো বাজার নেই, সেই হাটের দিনটা যদি বাবার বাউন্ডুলে বাতাসে হারায় তবে সারা সপ্তাহ না খেয়ে থাকতে হবে। বাবাকে খুজতে মা নেহালকে পাঠায় আর নিজে মনে মনে সওদাপাতির হিসাব মেলায়। নেহাল জানে বাবা ইয়ারদের সাথে বড়লোক বন্ধুর দোতলা ঘরে তাস খেলছে।


সদর দরজা দিয়ে ঢুকতে বাবার বড়লোক বন্ধু দাপুটে চেহারার সাথে দেখা হয়। অভাবের সংসারে মা সন্তানদের আদর লেহজটা খুব শক্ত করে শিক্ষা দিয়েছে। নাই ঘরের লাজুক ছেলে বাবার ধনী বন্ধুর সামনে দাঁড়ালে বুকের ভেতর এমনিতেই অজানা ভয় ধরে, বুক ধুক ধুক, ধুক। বিনয়ে গলে লাল হয়ে মুখটা বুকের কাছে নামিয়ে সালাম দেয়।


চাচা জিজ্ঞেস করে দুপুরে খেয়েছে কি-না। পেটের ক্ষুধার চেয়ে দরিদ্রতার ক্ষুদ্রতা ওকে আরো ভেঙে ফেলে, চাচার সরাসরি জিজ্ঞেসে মুখটা আরো নিচু হয়ে যায়, চাচা মুখটা তুলে চুমু খায়। শরীরের সাথে শরীর মিশিয়ে ওকে ঘরে নিয়ে যায়।


কাছে বসিয়ে ওর হাতে পঞ্চাশ টাকা গুঁজে দেয়, 'দাঁড়া তোকে কিছু খেতে দেই' বলে বেরিয়ে যায়। একটু পরে ঢুকেই ঘরে দরজা আটকিয়ে দিয়ে নেহালের দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায়, একটা চকলেট পুরে দেয় ওর মুখে। টান দিয়ে নেহালের হাফপ্যান্ট খুলে ফেলে। লজ্জায় কোঁকিয়ে ওঠে। চাচার আদরে অস্বস্তি বোধ করে, চাচার হাত ছাড়িয়ে বেরিয়ে আসতে চায়, কলাগাছের মতো উদোম ভারী পা দিয়ে চাচা ওর ছোট্ট শরীরটা ঢেকে ফেলে। উপর তলা থেকে বাবা ও বন্ধুদের উথাল হাসিতে নেহালের দু'কান ভরে ওঠে, হাসি ভালো করে শুনবার আগেই ওর শরীরের কেন্দ্রবিন্দু দিয়ে একটা লৌহ খন্ড ঢুকে যায়। পুড়ে যায়, জ্বলে যায়। জ্বলে যয়ে।। সমস্ত পৃথিবী ওর সামনে জ্বলেপুড়ে ছারখার হচ্ছে, দুঃখ-যন্ত্রণায় চিৎকার করে কাঁদতে চায়, পারে না। চাচা ওকে ছেড়ে দেয়, দাঁড়িয়ে ছোট্ট বুকটা চেপে ধরে, যদি ছিড়ে যায়। হাঁটতে কষ্ট হয়, আবার আক্রান্ত হবার ভয়ে দৌড়ে পার করে পথের দুরত্ব।


মা তখনও অপেক্ষা করছে, বাবার হদিস মেলেনি। 'চাচা এই ক'টা টাকা দিয়েছে', মায়ের হাতে টাকা গুঁজে ঘরে গিয়ে কান্নায় লুটায়।


চাচা প্রায়ই কেমন করে যেন খুঁজে পেত নেহালকে। ফেরার সময় হাতে থাকতো টাকা, খাবার। পাড়ার বড় ভাইরা ব্যাপারটা বুঝে যায়, আড়ালে-আবডালে ওকে নিয়ে মন্তব্যগুলো হওয়ায় ভেসে ওর কাছে আসত, 'হালার গোয়াডা খুব নরম রে', 'অহনই ওরে বেশ্যা বানাইল বুড়াডা'।


ওকে দেখলে পলাশ ভাই কেমন করে যেন হাসত, হাসিটা এখন আশরাফ স্যারের মুখে শোভা পায়।


ছোট্ট নেহালের অভিশাপেই কিনা এক রাতে চাচা উঁচু খাট থেকে পড়ে পা ভাঙে আর নেহালও নিস্তার পায় চাচার নোংরা লালসা থেকে। দীর্ঘদিন নেহাল রাতে ঘুমুতে পারত না, ওকে কুরে কুরে খেত ছোটবেলার অসহ্য স্মৃতি, অব্যক্ত মনোবেদনা।


এবার বাড়ি থেকে আসার সময় চাচাতো বোন শেফালী বলেছিল, 'নেহাল ভাই তুমি পুরুষই না, আমি কি চাই তুমি বোঝা না'। নেহালের খাঁচায় আটকানো পৌরুষ সিংহটা হুঙ্কার দিয়ে খাঁচা থেকে বেরুবার উপক্রম করতেই শুধুমাত্র দরিদ্রের কথা ভেবে নিজেকে গুটিয়ে এতটুকু করে ফেলে।


শফি ভাই নাইট কোচের হেলপার। তার কাছেই মায়ের জন্য টাকা পাঠায়। মা চিঠি পাঠায়। গত সপ্তাহে মা গ্রাম থেকে ফোনে জানিয়েছে টাকার প্রয়োজন, মাহাবুব ভাইকে বলতেই পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছে। এই টাকাটা পেলে সংসারে খুব উপকার হবে। খাবার-দাবারগুলো দেখলে ভাইবোনগুলো আনন্দিত হবে।


: কি নেহাল মিয়া, খুব তো চেকনাই অইছে তুমার চেহারার, ভাবেসাবে তো মুনে হয় সাহেব-সুবার চাকরি করো। হালা আমরাই পারলাম না চেহারায় চেকনাই দরাইতে, রাইতে জান্নি করতে করতে যৌবন ফুরাইল, দ্যাও তো বাই তুমার মতো একখান চাকরি জোটাইয়া।

নেহালকে দেখে গাড়ি থেকে নামতে নামতে বলে শফি। নেহাল নিচের দিকে চেয়ে হাসে। টাকা আর জৌলুস বিনিময় কতটা...


: শফি ভাই, নাস্তা খাইবা?


: খাওয়াইবা, খাওয়াও প্যাড ভইরা পরাটা-মাংস খাই।


হাপুস-হুপুস করে খাচ্ছে শফি ভাই। নেহাল তাকিয়ে থাকে অঘুমো শফির শক্ত


শরীরের দিকে।


কি মারাডাই না খাইলাম রে নেহাল।


চমকে তাকায় নেহাল শফি ভাইয়ের দিকে। শফি ভাইও... এই পুরুষ্ট শরীরেও... ওর গোয়াও...।


বেবাকে বুনল ভুট্টা আমি বুনলাম ধান। ভুট্টা বুইনা লাভ করল কত, আর ধান বুইনা আমি খাইলাম মারা।


: শফি ভাই তাও তো মাইনষের খাওন ফলাইছ- খড়গুলানও গরু খাইবার পারব। ধান না বুনতে বুনতে বীজ হারাইয়া গেলে পামু কই ধানের বীজ।


টুং-টাং মোবাইল বেজে উঠে নেহালের।


হ্যাঁ হ্যাঁ সব হয়েছে ঠিকঠাক মতোই। এখনই রওনা হচ্ছি। না না কোনো অসুবিধা নেই, আচ্ছা আচ্ছা।


মাহাবুব ভাই খোঁজ নিচ্ছে নেহালের ক্যাবে তাড়াতাড়ি বসতে গিয়েই টের পায় ব্যথা।


বাড়ি, শফি ভাই, শেফালী, ধান, ভুট্টা, সব যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে একরেখায়। পকেট থেকে টিস্যু বের করে নেয়। টিস্যু জল শুষে এতটুকু হয়ে যায়, হায়রে টিস্যু, ওর ছোট্ট শরীরের সাধ্য কোথায় পঁচিশ বছরের জল শুষে নেবার, শফি ভাই আর শেফালীরও কি আছে এমন সাদা ধ্বধবে একখানা টিস্যু। সারা বাংলাদেশ তো এখন সুদৃশ্য ভুট্টার চাষে সয়লাব। ধানের চাষ না হতে হতে ধানের বীজ একদিন হারিয়ে যাবে। মাটি পারে না এদেশের ঐতিহ্যবাহী ধানের বীজ, শেফালী পাবে না নেহালের ভালোবাসার বীজ। গাড়ী চলতে শুরু করেছে ধোঁয়ার আচ্ছন্ন ঢাকা শহর। আসলে ওগুলো ধুয়া নয়। অসংখ্য টিস্যু...।



Powered by Blogger.

আসুন করনা সম্পর্কে সচেতন হই সুস্থ থাকি ।