মওলানা দরবেশ আহমদ সম্পর্কে কয়েকটি অভিমত
প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ বলেন- 'মওলানা দরবেশ আহমদের বাড়ী ছিল গাবসারা। তিনি সবে হিন্দুস্থানের রামপুর (দেওবন্দ) মাদ্রাসা হতে পড়ে দেশে ফিরেছেন। সেকালে হিন্দুস্থান পড়ে যারা পাগড়ী নিয়ে বাড়ী আসতেন, তাঁদের কেউ কেউ পাগড়ী ছাড়া সাথে বিদ্যা ও নিয়ে আসতেন। মওলানা দরবেশ আহমদ সাহেব এই শেষক্ত দলের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি হাদীস কোরান পড়ার পর হেকিমী শিখে আসেন। এই স্বাধীন রোজগারের পথ থাকায় তিনি অন্যের মোহতাজ ছিলেন না, মাথা উঁচু রেখে ওয়াজ নছিহত করে যেতেন। তার চেয়ে বড় কথা, তাঁর হৃদয় ছিল পরম উদার ও পরহিতপ্রবণ। আপদে বিপদে কেউ তাকে ডাকলে 'না' বলতে পারতেন না।'
করটিয়া সরকারি সা'দত কলেজের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যন বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও কবি অধ্যাপক মীর সোহরাব আলী বলেন- 'মওলানা দরবেশ আহমদ প্রকৃত পক্ষেই ছিলেন একজন দরবেশ। তবে তিনি খানকার পীর দরবেশ ছিলেন না। তিনি এদেশের অশিক্ষিত ও কুশিক্ষায়, সমাজ সংস্কারক এবং জনগণের একান্ত আপনজন ছিলেন। দরিদ্র অসহায় রোগীদের তিনি বিনামূল্যে ঔষধ দিতেন। ক্ষুধার্তদের খাদ্য দিতেন, বস্ত্রহীনদের বস্ত্র কিনে বাড়িতে গিয়ে দিয়ে আসতেন। কোন সময় ভক্তরা তাঁকে কিছু খাবার দিলে তিনি আনন্দের সাথে তা গ্রহণ করতেন এবং তা নিজে না খেয়ে গোপনে অন্যদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন। এলাকায় হিন্দু মুসলিম সবার তিনি শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন।'
মওলানা দরবেশ আহমদের স্ত্রী বলেছেন- 'মওলানা খুব কম খেতেন, দিনে একবার ও রাতে একবার খাবার খেতেন। কিন্তু বেশি করে রান্না করতে বলতেন, যাতে ক্ষুধার্ত কেউ এলে তাদের খাবার দেয়া যায়। তাঁর নিজের কাপড় তিনি নিজে পরিষ্কার করতেন। তিনি রাত জেগে অনেক রাত পর্যন্ত নামাজ পড়তেন। কিন্তু অন্যের যাতে ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটে সেদিকে খেয়াল রাখতেন। বাসার কোনো কাজে তিনি কাউকে ফরমাইশ দিতেন না, নিজের প্রয়োজনীয় কাজ নিজে করতেন।'
মওলানা দরবেশ আহমদের ঔষধ তৈরি ও বিক্রয় কাজের সহকারী, যিনি বিভিন্ন সভা মাহফিলে সঙ্গে থাকতেন, বেতকা নিবাসী আনসার আলী বলেন- 'মওলানা হুজুর আমার পরিবারের অবস্থা জানতেন। আমি কখনো তাঁর কাছে টাকা পয়সা চাইতাম না। কখনো আমার প্রয়োজনের কথা তাঁর কাছে বলতাম না। কিন্তু তিনি আমার চাওয়ার আগেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত টাকা আমার হাতে দিতেন এবং জিজ্ঞেস করতেন, চলবে তো? অথচ আমি তাঁর কাছে অত টাকা কখনো পাওয়ার আশা করতাম না।'
মওলানা মমতাজ উদ্দীন আহমদ বলেন- 'মওলানা সাহেব প্রচুর টাকা কামাই করতেন।
কিন্তু কখনো সে টাকা পয়সা বক্সে রাখতেন না, জুব্বার পকেটেই রাখতেন। পকেট থেকেই খরচ করতেন। কেউ হাত পাতলে তাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিতেন না। তিনি টাকা পয়সা কখনো হিসাব করে খরচ করতেন না। অথচ পরিবার পরিচালনা, মেহমানদের মেহমানদারি ও দান-খয়রাত করে কখনো ঠেকতেন না।'
গোবিন্দাসী হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক জনাব মো. আবদুল হাই মিঞা লিখেছেন- 'তাঁর কাছে (মওলানা দরবেশ আহমদ) যারা দূর-দূরান্তর থেকে লেখাপড়া শিখতে আসতেন তাঁরা তাঁর বাড়িতেই খানাপিনা করতেন। এই খরচ কোথা হতে আসত তা জানার অবকাশ কারও ছিল না। যে সকল ছাত্র তাঁর কাছে লেখাপড়া শিখতে গিয়েছেন তাঁদের মধ্যে বাহাদীপুর নিবাসী মরহুম মৌলবী তৈয়ব উদ্দীন তালুকদার সাহেবের মুখে শুনেছি- 'হাটের দিন তাঁর হাতে যা কিছু থাকত তিনি পকেট উজাড় করে গরীব দুঃখীদের দান করে শূন্য হাতে বাজার করতে যেতেন। কোথা থেকে তিনি টাকা পয়সা পেতেন তা একমাত্র তিনিই জানেন। ধামা ভর্তি করে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয় করে নিয়ে বাড়ি আসতেন।' তাঁর এমনিতর অনেক আশ্চার্যপ্রদ কথা আমাদের এলাকয় কিংবদন্তির মত আজও ছড়িয়ে আছে। আমার মরহুম আব্বার কাছে শুনেছি। একবার ভূঞাপুর মিডল মাদ্রাসায় ধর্মসভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মওলানা সাহেব বক্তৃতা করতে উঠে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষণ বক্তৃতা দেয়ার পর উত্তর পশ্চিম আকাশে দারুণ মেঘ করল। কালবৈশেখী তার ধ্বংসের ছোবল মারবে বলে সভার জনতা উসখুস করতে লাগলো। জনতার এই উসখুস ভাব ও বাড়ি ফেরার জন্য সকলের উদগ্রীবতা লক্ষ্য করে তিনি
বললেন, 'বন্ধুগণ, আপনারা ব্যস্ত হবেন না। আল্লাহর ইচ্ছায় আজকে এই সভার অছিলায় এ এলাকায় ঝড় নাও হতে পারে। আপনারা ধৈর্য্য ধারণ করুন। বসে পড়ুন। আপনাদের জানমাল আত্মীয়-পরিজন আল্লাহ হেফাজত করবেন।'
'রাত এগারটা পর্যন্ত মওলানা সাহেব সুললিত ভাষায় তাঁর বক্তব্য রাখলেন। পরম বিশ্বাসের সঙ্গে জনতা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তাঁর ভাষণ শুনলেন। পরদিন সত্যি সত্যিই দেখা গেল ঐ ধর্মসভাকে কেন্দ্র করে চারদিকে ৪-৫ মাইলের মধ্যে ঝড় বৃষ্টি আদৌ হয়নি।' (মাসিক রেনেসাঁ, আবদুল হালীম খাঁ সম্পাদিত, ৫ম বর্ষ, ৬ষ্ঠ সংখ্যা)।
ভূঞাপুর সরকারি ইবরাহীম খাঁ কলেজের অবসর প্রাপ্ত অধ্যাপক বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য সমালোচক শংকর দাশ লিখেছেন- 'তিনি (মওলানা দরবেশ আহমদ) রোগীর বাড়িতে ঘোড়ায় চড়ে যেতেন শুকনো মওসুমে এবং বর্ষাকালে নৌকোযোগে। তিনি তপ্ত সূর্য কিরণের মধ্যে মাথায় ছাতা ব্যবহার করতেন না। মাথায় শুধু একটি আচ্ছাদন রাখতেন। এলাকায় ঘুরে ঘুরে আর্তমানুষের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিতেন তিনি। ফি হিসাবে গ্রামের লোকজন ফলমূল ইত্যাদি দিত। তিনি প্রসন্নচিত্তে তা নিয়েই বাড়ি ফিরতেন।
মওলানা দরবেশ সম্বন্ধে নিকলার কৃর্তি সন্তান ভূঞাপুর কলেজের এককালের অধ্যাপক বর্তমানে ভারতের অধিবাসী শ্রীযুক্ত রাখাল চক্রবর্তী বলেন, 'আমি ও মহত্মা দরবেশের পূন্যময় সান্নিধ্যে আসিয়াছিলাম। তখন আমি নিতান্ত বালক ছিলাম তবু তাঁর স্নেহ লাভে ধন্য হয়েছিলাম।' মওলানা দরবেশের গাত্র বর্ণ ছিল ফর্সা, মুখ ছিল হাসিমাখা। চক্রবর্তী লিখেছেন- তাঁর জবান ছিল মিষ্টি। তাঁর ফর্সা গাত্র বরণের ন্যায় তাঁর অন্তর ছিল দুধে ধোয়া ধবধবে।' (গোলাম রব্বানী রতন সম্পাদিত ভূঞাপুরের ভালোমানুষ)।
