হারজিত
সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ঘুমটা যখন ভাঙ্গে তখন বাইরের পৃথিবীতে মধ্যাহ্নের আয়োজন।
গোসল সেরে নিজেকে গুছিয়ে রুমের দরজায় পা রাখে, ফ্ল্যাটের ঝকঝকে তকতকে রূপ দেখে মনটা প্রশান্তিতে ভরে যায়। রাতের ছাপ বিলুপ্ত হয়ে এক সৌখিন গৃহবাসীর গৃহ এটি যেন। বুয়াটা ওর রুচী ধরতে পারে। পারবেনা কেন দীর্ঘ দিন ধরে আছেনা ওর সাথে।
ডাইনিং টেবিলে বসে দৈনিকের পাতায় চোখবুলায়। ওর বাসায় দুতিনটে দৈনিক তিন চারটে সাপ্তাহিক রাখা হয়। এর মধ্যে আবার একটি ইংরেজি দৈনিকও আছে। বাংলা দৈনিকের হেড লাইনগুলোতে চোখ বুলায় ভাললাগলে ভেতরের বিস্তারিত খবর পড়ে নইলে শুধু হেড লাইন পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে ইংরেজি দৈনিকটার পৃষ্ঠা উল্টানেতেই পড়া শেষ। বাংলা দৈনিকের সাথে ইংরেজি দৈনিকের ছবি মিলিয়ে বুঝতে চেষ্টা করে খবরটা কি হতে পারে। বাংলা দৈনিক গুলোর ভয়াবহ ছবি এবং ভয়ঙ্কর হেডিং দেখে পড়ার উৎসাহ শূন্যের কোটায় চলে আসে।
বুয়া গরমা গরম নাস্তা সাজিয়ে দেয় টেবিলে। কাগজ থেকে চোখ সরিয়ে নাশতার আয়োজন দেখে নেয়। অংক কষে খাবার পাতে তুলবে। শরীরের যেখানে যতটুকু মেদের প্রয়োজন ঠিক ততটুকই আছে দীর্ঘ দিন, এর চেয়ে এক রত্তিও বেশি জমতে দেয় না।
পত্রিকা পড়ার ফাঁকে ত্বক ও পেশী সুরক্ষাকারী পথ্য সেরে নিয়ে, এখন চামচ দিয়ে পরিমাপ মতো সবজি সেদ্ধ তুলে। দীর্ঘদিন এমন খাবারেই অভ্যস্ত তাই খারাপ লাগেনা তেল-মশলা বর্জিত খাবার খেতে। অনেক সময় নিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে সকালের বরাদ্ধ খাবার খাবে, পত্রিকা পড়বে।
মূল কাগজে চোখ বুলিয়ে সাপ্তাহিকের বাহারী আয়োজনটায় চোখ বুলায়। ভারী ভারী সব সাহিত্যের আলোচনা বিখ্যাত কবিদের সমৃদ্ধ কবিতা। এসব কোনদিনই ওকে টানে না। টানবেই বা কেন ওর মতো শুধু বাংলা লিখতে পড়তে জানা মানুষকে ও গোগ্রাসে গেলে ফ্যাশান রূপ চর্চা, রান্না বান্না, ঘর সাজানো।
কবিতা না বুঝলেও কবিদের নামে চোখ বুলায়, ওর চোখ খুঁজে ফেরে রাতে ওর এখানে যারা আসে তা কি কেউ পত্রিকার পাতায় আছে কি না, থাকলে তক্ষুণি ফোনে জানিয়ে দেয়। 'কবিতা দেখলাম চমৎকার লেগেছে'।
জনপ্রিয় দৈনিকের সাহিত্যের পাতার গল্পটা টানছে ওকে। খাবার শেষ করে সাহিত্যের পাতাটা নিয়ে বারান্দায় বসে।
গল্পের নাম 'চল গ্রামে ফিরে যাই' লেখক ওর চেনাই না শুধু, ওর এখানকার অতিথীও বটে। গল্পটার নাম আর লেখক দুই মিলেই ওকে আকর্ষণ করছে।
এক নিশ্বাসে পড়ে ফেলে গল্পটা। গল্পের নায়িকা শাহানা সদ্য বিবাহিত এক রমনী।
স্বামী আরিফ দুজনে মিলে এই শত যন্ত্রণার নগরীতে নীড় বেঁধেছিল। স্বামীর কর্মস্থল বলে কথা। এই নগরী শাহানার ভালোলাগতো না। মাঝে মাঝেই সে স্বামীকে গ্রামে ফিরে যেতে আকুতি জানাতো। স্বামীর অনুপস্থিতিতে দুজন দূবৃত্ত দ্বারা অপহৃত হয়। নিজের ঐশ্বর্য লুট হবার পর উপায়ন্তর না দেখে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় শাহানা। স্বামী আরিফের কাছে ফিরে আসে শাহানার লাস। স্ত্রীর আকস্মিক ও অস্বাভাবিক মৃত্যুতে আরিফ বিহ্বল শোকাচ্ছন্ন। আরিফের কানে বাজতে থাকে স্ত্রীর আকুতি 'চল গ্রামে ফিরে যাই'।
লেখক ঝরঝরে একখান গল্প উপহার দিয়েছেন কোথায়ও ছন্দপতন নেই। পাঠক প্রিয় হবে গল্পটা।
গল্পটা নিয়ে লেখকের সাথে এই মূহূর্তে আলোচনা করতে ইচ্ছে হচ্ছে। ভদ্রলোক খুশীই হবেন। ভেবে মুঠোফোনটা হাতে নিতেই ইচ্ছেটা উর্বে যায়। ফোনটা রেখে দেয় ও নিজের সাথে নিজেই যেন গল্প বলতে শুরু করে।
সুজলা সুফলা শ্যামলা গ্রামের এক সহজ সরল মেয়ে। জন্মের সময় আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি হয়েছিল আকাশের এমাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছিল বিকট আওয়াজের বাজ। যে মেয়ে বাজের বিশাল আওয়াজ আর ভয় ধরানো আলো নিয়ে এসেছে। আর পৃথিবীর আলো স্পর্শ করেই যে কেঁদে কেটে একাকার করে ফেলে। ঝড় জল আলো আওয়াজের এই মেয়ের গায়েররংও আবার বিদ্যুৎছটার মতো। দাদীজান তাই ওর নাম রাখে 'বিজলী'। বাবা আদর করে ডাকে 'বিজু'। বাবা পরের জমিতে সাড়ে তিন হাত শরীরটা খাটিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতো। এটাই তার পূর্ব পুরুষের পেশা। সন্তানদের শিক্ষা দেবার ব্যবস্থা বলতে সকালে জুম্মা ঘরের বারান্দায় চট বিছিয়ে ইমাম সাহেবের কাছে আমপাড়া পড়া। এটুকু মুফতে পাওয়া যেত আর মুসলমান ঘরের মেয়ে ধর্ম শিক্ষাতো হচ্ছে তাই।
গাঁয়ের মাষ্টার সাহেব একদিন বাবাকে জানালেন প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাও সরকার ফ্রি করেছে এবং সাথে পাওয়া যায় বেশ কিছু সুযোগ সুবিধা।
প্রাথমিক পাঠ সমাপ্তির সাথেই শেষ হয়ে যায় ওর ছাত্র জীবন। মায়ের কাছ থেকে শিখে নেয় চিক্কন সেমাই কাটা নকশী কাঁথা সেলাই, বাহারী ফুল পিঠা বানানো পরিপাটি করে উঠোন নিকানো। মা পরের বাড়ি থেকে এই কাজগুলো জোগাড়করে আনতো তখন মায়ের ডান হাত ছিলো ও। এতে সংসারে দু'টো পয়সা আসতো। সবাই মিলে কাজ করেও সংসারের অভাব দূর করতে পারতো না।
কৈশোর পার করতেই মা দাদী বিজুর বিয়ের জন্য অস্থির হয়ে পড়ে। বিজুর গা ভরা রূপ দেখে প্রস্তাব আসে কিন্তু বাবার হতদরিদ্র অবস্থা দেখে ফিরে যায়।
বর্ষার প্রথম জলের স্পর্শ পেয়ে যেমন লকলক করে বেড়ে উঠে কুমড়ো লতা সুষমা ছড়ায় পাতায় পাতায়, তেমনি যৌবনের প্রথম লগ্নে লকলকে নধর হয় বিজলী।
ওকে দেখেই গোফরান মিয়া প্রস্তাব পাঠায়। গোফরান মিয়ার তিনকুলে কেউ নেই। সেই কবে গ্রাম ছেড়ে কাজের খোঁজে শহরে গিয়েছিল। শহরেই কি সব ব্যবসা করে বেশ কিছু কামাই করে এনেছে। এখন বাপ দাদার ভিটায় ঘর তুলে সংসার করবে। গোফরান মিয়ার হাতে আছে নগদ টাকা ঘর তুলতে সময় লাগবে না। কিন্তু ঘরে থাকবে কে, এমন সময় দেখা মিললো বিজলীর।
খোলা শহরের চপল মেয়ে পছন্দ নয় বলেই এতদিন বিয়ে হয়নি। তবে পুরুষ মানুষের বয়সটা বিয়ের ক্ষেত্রে ধরার বিষয় নয় টাকা পয়সা যথেষ্ট আছে শরীরটাও গোট্টা গাট্টা।
বিজলীদের ঘরে তো বিয়ে করার জন্য রাজপুত্র কোটাল পুত্র আসবে না। যারা আসে তারা যৌতুকের লোভেই আসে। সংসার নিংড়ে যৌতুক নিয়েই বিয়ে করে বিজলীদের। গোফরান মিয়া যৌতুক নিচ্ছে না উপরন্ত দুপদের সোনার গহনা দিয়ে বিয়ের সমস্ত ব্যায়ভার নিজের কাঁধে নিয়েই বিয়ে করছে।
গোফরান মিয়ার যৌবন পড়ন্ত বেলায় গেলেও বিয়ের পরের দিনগুলো খুব সুখের হয়। মৌজ মাস্তিতেই দিন কাটে গোফরানের। নিজের বাড়িতে ঘর তোলার কথা মনেই পড়ে না।
প্রায়ই বাজার থেকে মাছ কিনে আনে আনারস কিনে আনে। মা দাদীর জন্য নতুন শাড়ি কিনে আনে। বাবাকে গরু কিনে দেবে এমন কথাও বলে।
বিজলী অবাক হয়ে ভাবে ওদের জীবনেও তাহলে বড়বাড়ির মত আনন্দ আছে।
গোফরান মিয়া বিজলীকে কত শহরের গল্প বলে সিনেমা বাস, গাড়ি বড় বড় দালান সুন্দর সুন্দর মানুষ লোভনীয় খাবার আরো কত কি।
ইস একবার যদি যেতে পারতো পাশের বাড়ির টিভিতে দেখা গোফরানের শহরে। স্বামীর কাছে মনের গোপন বাসনা প্রকাশ করে।
গোফরান বিজলীর মা বাবা দাদীর জন্য কত কি করছে আর নিজের স্ত্রীর জন্য এটুকু করবে না। ওরা দুদিনের জন্য শহরে যাবে সিনেমা, পার্ক, মার্কেট, চলন্ত সিড়ি দেখিয়ে আনবে।
বিজলী শহরে যাবার সময় মা চিড়া মুড়ির মোয়া বেঁধে দিতে থাকে, গোফরান মিয়া হেসে কুটি পাটি শাশুড়ীর কান্ড কারখানা দেখে।
আম্মাজান এগুলা কিছুই লাগব না।
আঁতকে উঠে শাশুড়ী!
: কি কও লাগব না, তাইলে শহরে গিয়া খাইবা কি?
: আম্মাজান শহরে কি খাওন কম আছে নি। দোকানে দোকানে ব্যাডারা রাইন্দা বাইড়া সাজাইয়া রাখছে আপনের মেয়ার যহন সেটা খাইতে মন চাইব অর্ডার দিব আর খাইব।
তাজ্জব বনে যায় বিজলীর মা, তার চৌদ্দ গুষ্টিতে কেউ শহরে যায়নি। শহরের কায়দা কানুন তাই রয়ে গেছে তার কাছে অজানা। এতো সুখের শহর। সেখানে যাচ্ছে তার মেয়ে এটুকুতেই পরম প্রাপ্তি।
শহরে এসে হকচকিয়ে যায় বিজলী, এতো মানুষ! এতো গাড়ি। এতো আলো, শক্ত করে গোফরানের হাত ধরে রাখে।
সারাদিন বিভিন্ন মার্কেট ঘুরে, পার্ক ঘুরে রাতে গোফরানের খালার বাড়িতে যায়। খালাতো বউদেখে খুব খুশী খুব সুন্দর মেয়েকে বিয়ে করেছে গোফরান।
বিজলী দেখছে কি ঝকঝকে তকতকে বাড়ি, কারুকার্জ করা দরজা জানালা কত অচেনা আসবারপত্র।
কি সুস্বাদু খাবার পেটের ক্ষুধা মিটে গেলেও খেতেই ইচ্ছে করছে। নরম তুলতুলে বিছনায় গোফরানের বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে। সকালে গোফরানের দেখা আর মিলে না। রাতের মাতৃস্নেহের খালা এবার তার লুকানো হাঙ্গর দাঁত বের করে।
গোফরান এর আগেও এমন বিয়া কইরা আনছে পনর-ষোলজনরে।
পনর ষোল জন কন কি খালা আপনে।
হ আনব না কেন আমার কাছে আইনা দিয়াই তো ট্যাকা লইয়া চইলা যায়। বউগুলানরে বেইচ্যা দিয়া যায়।
বেইচ্যা দিয়া যায়। বউ গুলানরে দিয়া আপনে কি করেন।
t ব্যবসা করি বুঝবা বুঝবা যাউক দুই তিন দিন।
। দুই তিন দিন লাগব না আমারে আমার বাবার কাছে পাঠাইয়া দেন।
: তাইলে নগদ পঞ্চাশ হাজার ট্যাকা অহন আমারে দেও।
কি কৌশলে যে নিষপেশনের যন্ত্রের মধ্যে ফেলে দেয়।
এর পর বিজলীর নতুন পৃথিবী নতুন জীবন। খালাই সব শিখিয়ে পড়িয়ে দেয়। সিনেমার নায়িকার সখী হয়ে শরীরের বিশেষ বিশেষ বাঁকের উন্মোচন খালার অতিথীদের বিশেষ আপ্যায়ন।
কিছুদিন পর খালার থাবা থেকে মুক্ত করে নিজেকে। ততদিনে বিজলী হয়ে গেছে বহু নামের অধিকারী। শিখে গেছে বাঁচার পথকে পোক্ত করতে।
গ্রামে আর ফিরে যায় নি বিজলী, তবে বাবার নামে প্রতিমাসে যায় বিজলীর মানি অর্ডার। শুনেছে ছোট ভাই দু'টো লেখাপড়া করছে, বোনটার ভাল ঘরে সুপাত্রের কাছে বিয়ে হয়েছে। বড় বড় দুটো ঘর তুলেছে। গোয়ালে পাঁচ ছটি গরু আছে ধানি জমিও কিনেছে কিছু, সব মিলে ভালো আছে বিজলীর পরিবার।
শহরের অভিজাত এলাকায় বিশাল ফ্ল্যাট নিয়ে থাকছে বিজলী ওর ব্যবসা ছড়িয়ে আছে অন্য এলাকায়। কর্মচারীরা দেখছে ওগুলো।
সেদিনের সেই গোফরান মিয়া ওর কাছে যারা আসে তাদের জুতো মোছারও যোগ্যতা রাখে না। গোফরানের সাথে আর কোন দিনই দেখা হয়নি ওর।
শুধু সামাজিক নয় রাজনৈতিক যোগাযোগও বিজলীর অনেক উপরে। কখনও শোনা যায় কোন বড় পদও পেতে পারে বিজলী। পদ পদবী কিছুই চায় না চায় শুধু নিব্রিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যেতে।
তবু আজ এই গল্পটা পড়ে নিজের ভেতরে ডুবে যায় বিজলী। ওর তো মহিমাময় মৃত্যু হয়নি, বেঁচে আছে নীল যন্ত্রণায় লীন হয়ে।
শাহানারা কেন ভাবে গ্রামে ফিরে গেলেই সব সমস্যার সমাধান। স্বামীর ভালোবাসাময় বুকের ওম আশ্রয়ও যে ভেঙ্গে চুরে দেয় দূর্গের মহাজন নিজেই।
ও তো কান্না ভুলে গেছে কবেই, আজও কাঁদছে না তবে প্রতিদিনের মতো পুড়ছে। কেন আজ পুড়ছে বিজলী নিজেকে নিজে প্রশ্ন করে?
গল্পের শাহানার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে না নিজের পরাজয়ে? শাহানা আর বিজলীকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে দেয়, বিজলীর নিরন্তর সংগ্রাম বেঁচেথাকা অসীম গ্লানি বয়ে আর শাহানার সোহাগী জীবন অভিমানী মৃত্যু? শাহানা কি জিতে গেছে নাকি বিজলী বেঁচে থেকে হেরে গেছে? শাহানার মৃত্যু কি হেরে যাওয়া নয়? প্রশ্নে প্রশ্নে নিজেকে চাবকাতে থাকে বিজলী যার আজ অনেক রকমের নাম।
