তাবলীগ জামাতের বরকতে আমলে এক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে
বর্তমানে যদিও হযরতে ওলামায়ে কিরাম দাওয়াতও তাবলীগের কাজে সর্বদা নিয়োজীত আছেন। এরপরেও আল্লাহতায়ালা সকল শ্রেনীর মাঝে তাবলীগের কাজ করার কৌশল ও পদ্ধতি হযরত মাওলানা ইলীয়াস (রহঃ) এর অন্তরে ইলক্কা করেন। আল্লাহ তায়ালা মাওলানার অন্তরে এমনই ইলহাম করে তাবলীগের এমনই পদ্ধতি নির্ধারন করে দিয়েছেন যার প্রভাব সমাজে ফেলতে সক্ষম হয়েছেন।
তাবলীগ জামাতবদ্ধভাবে সুসংগঠিত একটি মেহেনতের নাম। একক ভাবে কেউ তাবলীগে বের হয়না, বরং জামাত বদ্ধভাবে মানুষকে দ্বীনের দাওয়াত দিয়ে ঘর থেকে বের করে নিয়ে আসে। আবার তাদের নিয়ে গাস্তে যায় এবং প্রত্যেকে একই জবানে মানুষকে দাওয়াত দিয়ে থাকে। কুদরতী ভাবে সমাজের মধ্যে উহার প্রভাব বিস্তার হয়। যদিও কেহ কেহ্ এই মোবারক কাজের বিরোধীতা করে তবুও তাদের আপত্তিকে কেহ্ আমলে আনে না।
পৃথিবীর সূচনা হতে অদ্যবধি সমালোচক ও ইসলামের দুশমনের দল সমাজে আছে কিন্তু তাদের আপত্তি আর দুশমনীর দিকে কেহই কর্ণপাত করেনা। বরং হকুপন্থী ও জ্ঞানী লোকদের কাজের গ্রহন যোগ্যতা বিবেচনা করা হয়।
আল্লাহ তায়ালা বিশেষ অনুগ্রহ করে হযরত মাওলানার অন্তরে ইলকা করেন যে তিনি কি ভাবে কোন কৌশলে বা কোন পন্থায় মানুষকে দ্বীনের দিকে আহবান করবেন। মানুষ যখন আপন বাড়ীতে অবস্থান করে তখন তার আমলের প্রতিবন্ধক সৃষ্টিকারে আরামের বস্তুসমূহ ব্যবহার করার ফলে কখনো বা নামাজ তরক হয় আবার কখনো অন্যান্য আমলের বিগ্ন ঘটে। কিন্তু যখন বাড়ী থেকে বাহিরে আসে তখন আরামের সামগ্রী থেকে দুরে থাকার ফলে আল্লাহ তায়ালার জিকিরে মশগুল থাকা ছাড়া কোন গতান্তর থাকেনা।
আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়ার ফলে এই জামাতের দ্বারা শুধু দাওয়াত ইলাল্লাহর জমাতই কায়েম হয়না বরং এর মাধ্যমে এমন একটি আমলের পরিবেশ কায়েম হয়েছে যার দ্বারা সবাই ইযাদতে মশগুল থাকতে বাধ্য হয়। আর এটা অনুকূল পরিবেশের প্রভাবেই সম্ভব হয়েছে।
মানুষ যখন কোন আল্লাহওয়ালা ব্যক্তির ছোহবত হাছিল করবে তখন সে নিজেই আল্লাহ নাম নিতে বাধ্য হবে। হযরত মাওলানা রশীদ আহম্মদ গাংগুহী (রহঃ) বর যাত্রীদের সাথে থানাভবন এলাকায় কোন এক বিবাহের অনুষ্ঠানে যোগদান করেছিলেন তৎকালীন যুগে থানা ভবনে এই প্রথা প্রচলীত ছিল যে, কোন বরযাত্রী আসলে প্রথমেই এলাকার কোন বুজুর্গ ব্যক্তির সাক্ষাৎ করতে হয়। আর তখন হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজীরে মার্কী (রহঃ) থানা ভবন অবস্থান করছিলেন।
বিবাহের বরযাত্রীগন গাংগুহী (রহঃ) কে হাজী সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ করতে অনুরোধ করায় তিনি তার সাথে সাক্ষাতে মিলিত হন। হাজী সাহেব তার সাথে সাক্ষাতে মিলিত হন। হাজীসাহেব তার আধ্যাত্বীক শক্তি বলে অন্তদৃষ্টির মাধ্যমে বুঝতে পারলেন যে মাওলানা গাংগুহী (রহঃ) এর ভিতর কিছু মনি মুক্তা লুকায়ীত আছে।
ততক্ষনাৎ হাজী সাহেব (রহঃ) গাংগুহী (রহঃ) কে প্রশ্ন করেন তুমি কি কারো নিকট বাইয়াত গ্রহন করেছ? উত্তরে গাংগুহি সাহেব (রহঃ) জবাব দিলেন না হযরত আমি কাহারো নিকট বায়আত গ্রহন করি নাই। অতঃপর হাজী সাহেব বললেন তাহলে আমার নিকট বায়আত গ্রহন করে নাও।
হাজী সাহেব আশাবাদ ব্যক্ত করে আন্তরিক ভাবে গাংগুহী সাহবকে তাহার নিকট মুরীদ হওয়ার জন্য আহবান জানালেন। এবারও গাংগুহী সাহেব বললেন হযরত আমি তো এখানে কারো কাছে বায়আত হওয়ার জন্য আসি নাই বরং আমিতো বরযাত্রী হয়ে বিবাহের অনুষ্ঠানে এসেছি মাত্র। হাজী সাহেব বললেন ঠিক আছে বরযাত্রী হয়ে এসেছো তার সাথে মুরীদও হয়ে যাও।
গাংগুহী (রহঃ) বললেন আমি যদি এখন আপনার কাছে বায়আত গ্রহন করি তাহলে তো আপনি আমাকে এখানে অবস্থান করে আল্লাহর জিকিরে মশগুল থাকতে বলবেন। এটা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি কি আপনার দরবারে বসে আল্লাহর জিকিরে মশগুল থাকবো না আমার সাংসারীক কাজ করবো। হাজী সাহেব বললেন না ভাই আমি তোমাকে আমার দরবারে অবস্থান করতে বলবো না। এভাবে তিনি গাংগুহী (রহঃ) কে মুরীদ হওয়ার জন্য বারবার পিড়াপিড়ী করতে লাগলেন আর গাংগুহী (রহঃ) ও আপত্তি করতে লাগলেন।
অবশেষে হযরত গাংগুহী (রহঃ) হাজী সাহেবের নিকট বায়আত গ্রহনে বাধ্য হলেন। বায়আত গ্রহনের পর হাজী সাহেব গাংগুহী (রহঃ) কে তাহার দরবারে ৪১দিন অবস্থান করতে বললেন। তখন গাংগুহী (রহঃ) বলেন আপনার দরবারে অবস্থান করতে হবে বিধায় মুরীদ হতে চাই নাই। হাজী সাহেব বললেন আচ্ছা ঠিক আছে ২০দিন অবস্থান কর। গাংগুহী (রহঃ) বললেন না হযরত আমার পক্ষে ২০দিনও থাকা সম্ভব নয়। অতপর তিনি ১০দিন থাকার আহবান জানালেন। এতেও তিনি আপত্তি করে অবশেষে মাত্র তিন দিন অবস্থান করার জন্য রাজি হলেন।
ওই দিকে বরযাত্রীসব বিদায় হয়ে গেল আর গাংগুহী (রহঃ) হাজী সাহেব এর দরবারে অবস্থান করতে লাগলেন তিনি যখন রাতে খানকায় শুয়ে ছিলেন, রাত ৩টার সময় ঘুম থেকে জেগে দেখেন খানকার মধ্যে কেউ তাহাজ্জুদ নামাজ, কেউবা জিকিরে মশগুল আছেন। এই দৃশ্য দেখে তিনি আন্তরীক ভাবে খুব লজ্জাবোধ করতে ছিলেন যে সবাই ইবাদতে মশগুল আর আমি শুয়ে থাকবো তা কি করে হয়? অবশেষে তিনিও উঠে ওযু করে ৪ রাকআত নামাজ আদায় করে নিলেন।
পরবর্তি রাতে তিনি এরাদা করলেন আজ আর যাই হোক আজকে ঘুম থেকে উঠবেনা। কিন্তু আবারো রাত যখন ৩টা আর খানকার অন্যান্য লোকজন ইবাদতের নিয়তে ঘুম থেকে উঠছে তখনও তিনি শুয়ে শুয়ে আবারো সেই নিয়তই করলেন যে না আজকে আমি উঠবই না কিন্তু পরিবেশের কারনে তিনি আর শুয়ে থাকতে পারলেন না। খানকার পরিবেশ তাহাকে ঘুম থেকে উঠতে বাধ্য করলো। অবশেষে তিনি উঠে তাহাজ্জুদ নামাজও পরলেন আবার কিছুক্ষন জিকির ও করলেন।
এভাবে যখন তিন দিন আতিবাহিত হল আর তাহার অন্তরে একটা প্রভাব অনুভূত হলো তখন তিনি হাজী সাহেব (রহঃ) নিকট আরো কিছু দিন খানকায় অবস্থানের জন্য অনুমতী প্রার্থনা করলেন। তখন হাজী সাহেব গাংগুহী (রহঃ) কে বললেন আমি তোমাকে এখানে অবস্থানের জন্য কোন রূপ আদেশ দান করছিনা বরং থাকা বা না থাকা সম্পূর্ন তোমার ইখতিয়ার।
তারপর হযরত রশিদ আহম্মদ গাংগুহী (রহঃ) উক্ত খানকায় আরো ১০দিন পরবর্তিতে ২০দিন পরিশেষে ৪০ দিনেরও কিছু অতিরিক্ত সময় কাল অবস্থান করলেন। অতঃপর তিনি হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজীরে মক্কী (রহঃ) এর খিলাফাত লাভে ধন্য হয়ে সেখান থেকে প্রস্থান করেন।
অনুরূপভাবে মাওলানা ইলিয়াস (রহঃ) ও এমনি এক জামাতী আদর্শ স্থাপন করলেন যেখানে পরিবেশগত প্রভাব সৃষ্টি করেন। আর সেই পরিবেশের প্রভাবেই মানুষ সর্বদা আল্লাহর জিকির ও ইবাদত করতে বাধ্য।
