TjT

করনা প্রতিরোধে হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার মেনে চলুন। অপরিষ্কার হাত দিয়ে চোখ, নাক ও মুখ স্পর্শ্ করা থেকে বিরত থাকুন। অ্যালকোহল যুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার হাতের তালুতে নিয়ে ( 20 সেকেন্ড ) ভাল করে পরিষ্কার করুন। ব্যবহৃত টিস্যু ঢাকনা যুক্ত ডাস্টবিনে ফেলুন। পরিচিত বা অপরিচিত ব্যক্তির সাথে হাত মেলানো বা আলিঙ্গন করা থেকে বিরত থাকুন। আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকুন।

জিনের বাদশার দরবারে

মক্কা-মদীনায় গিয়ে হজ্ব সম্পূর্ণ করার পর দরবেশ আহমদ চিন্তা করলেন মদীনা মসজিদে কিছু দিন অবস্থান করবেন। হজ্বের পর সেখানে কিছু হাজী অবস্থান করে থাকেন। দরবেশ আহমদ ও অবস্থান করতে লাগলেন। একদিন মাগরিবের নামাজের


পর দরবেশ আহমদ মসজিদ চত্তরে বসে ছিলেন। তাঁর আশে পাশে ও কয়েকজন হাজী বসে বসে আলাপ করতে ছিলেন। এ সময়ে দূর থেকে নূরানী বেহারার অর্ধ বয়সী একজন লোক দরবেশ আহমদের দিকে বার বার তাকাচ্ছিলেন। দরবেশ আহমদের চেহারা ছিল দেখার মতোই ফর্সা, সুদর্শন, মানান সই স্বাস্থ্য মুখে কালো মিছমিছে চাপ দাঁড়ি, চেহারায় ও ছির উজ্জ্বল দীপ্তি। তিনি যেখানে যেতের অপরিচিত লোক অন্তত একবার তাকে তাকিয়ে দেখতো। কখনো কেউ তাঁর সঙ্গে উপযাচক হয়েই কথা বলতো ও আলাপ করতো। সেই নূরানী চেহারার লোকটি দরবেশ আহমদের কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি বাংলাদেশ থেকে এসেছেন? জী।

কোথায় কি করছেন বর্তমানে?


আগ্রায় চিকিৎসা শাস্ত্র পড়ছি।


আপনাকে দেওবন্দ মাদরাসায় দেখেছিলাম একবার।


জী। সেখানে আমি লেখাপড়া করেছি।


এখন কোথায় যাবার নিয়ত করেছেন?


আল্ল্যাহর, মর্জি।


আমার বাসায় মেহমান হলে খুশি হবো।


আপনার বাসা কোথায়?


কাছেই। আপনার যেতে তখলিপ হবে না।


কী নাম আপনার?


মুনশী মিয়াজান বলে লোকে ডাকে।


আপনি কি কাজ করেন?


তেমন কোন কাজ করি না, বেড়াই আর খাই।


তাঁর কথাবার্তা মনে হলো নিশ্চয় তিনি একজন সৎ মানুষ। ভাসমান অবস্থায় না থেকে তার মেহমান হওয়াই ভালো। তাই রাজি হলাম। এশার নামাজের পর তিনি আমাকে সঙ্গে নিয়ে চললেন তাঁর বাসায়। তাঁর বাসাটি জন মানুষের বসতি থেকে বেশ দূরে।


সুন্দর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন স্থান। রাস্তার দু'দিকে ফল ফুলের গাছ। তাঁর বাসার চারদিকে নানা রকম ফল ফুলের গাছ। ছায়া ঢাকা কোলাহল হীন মনোরম পরিবেশ। টিনসেট বিরাট এক ঘর। বহু কক্ষ বিশিষ্ট। মনে হলো বহু লোক এখানে বসবাস করে। আমাকে


ঘরে একটি কক্ষে নিয়ে তিনি বললেন, আপনি এ কক্ষে থাকবেন। আপনার ফরমাইশ করার লোক পাবেন, সময় মতো খানা আসবে। আপনি একটু বিশ্রাম করুন। এ কথা বলেই তিনি ভেতরের অন্য কক্ষে প্রবেশ করলেন। ভেতরে কিছু সংখ্যক মহিলার কন্ঠস্বর শোনা গেল। রাত যতই বারতে লাগলো মহিলাদের আগমন মনে হলো বাড়তে থাকলো। মোলায়েম কণ্ঠস্বর কথাবার্তা আর হাসাহাসি ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে লাগলো।


আমার খারার এলো। খারার পর ফল আর মিষ্টি এলো। সব খেলাম। খেতে খুব স্বাদ পেলাম। খেয়ে একটা পাতলা কম্বল গায়ে জড়িয়ে শুয়ে পড়লাম। খুব আরাম বোধ করতে লাগল। কিন্তু মনে হতে লাগলো, মিয়াজান মুন্সী কেমন মানুষ?


আসলে উনি কি কাজ করেন?


ফজরের নামাজের পর মুনশী সাহেব আমার কক্ষে ঢুকে হাসি মুখে জিজ্ঞাস করলেন,


রাতে কি আপনার কোন কষ্ট হয়েছে?


জী না।


এখানে কিছু দিন থাকলে কি আপনার কোন ক্ষতি হবে?


জীনা।

এখানে থাকলে আপনার যদি কোন কষ্ট না হয়, তবে কয়েকদিন থাকার অনুরোধ আমার। তিন দিন তিন রাত থাকার পর এই স্থানের প্রতি কেমন যেনো এক প্রকার আকর্ষণ সৃষ্টি হয়ে গেলো। কোন লোকজনের সঙ্গে দেখা স্বাক্ষাত নেই, আলাপ আলোচনা নেই, তবু এই স্থানটা বিশেষ করে এই বাসাটা মোহবিষ্ট করে ফেললো।


দিনে কোন লোকজনের সাড়া শব্দ পাই না। মাগরিবের পর থেকে লোকজনের আনাগোনা শুরু হতে থাকে। নারী কণ্ঠের কথা আর হাসাহাসি। কি বিষয় নিয়ে তারা হাসাহাসি করে তা বুঝি না তবে মনে হয় কোনো সুসংবাদ নিয়ে তারা কথা বলে আর হাসাহাসি করে।


কোনো মানুষের সুসংবাদ শুনলে আনন্দ লাগে।


কারো সুখের হাসি দেখলে হাসতে ইচ্ছা করে।


আমি একা রুমে একা মনে মনে হাসি


আর আনন্দ বোধ করি।


কারো মুখে কখনো অমার্জিত বা অশালীন কথা শুনি না। ভেতরে কি হয় কে কি করেন তা বুঝি না। আমার মনে হতে লাগলো আমার পরিচিত পৃথিবী থেকে এটি অন্য এক জগত, অন্য মানুষের জগত। এখানের কোনো কিছুই আমার খারাপ লাগে না, বরং খুব ভালো লাগে। মনে মনে ভাবতে লাগলাম, সারাটা পৃথিবী যদি এমন আনন্দময় হতো। রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবলাম, সকালেই মেজবানের সঙ্গে বিষয়টা নিয়ে আলাপ করবো। সকলে আবার রুমে মেজবান এলেই তাঁর কথার আগেই আমি জিজ্ঞাস করলাম,


আপনার বাসায় কে রাত্রে রান্না করেন?


সারাদিন তো কোন লোকজনের সাড়া পাই না, শুধু রাতে লোকজনের কথা শুনি।


মিয়াজান মুনশী আমার কথার কোনো জবাব না দিয়ে শুধু মিষ্টি করে হেসে বললেন,


রাতে আপনাকে এক দাওয়াতে নিয়ে যাবো। তখন বুঝবেন। রাতে মুনশী সাহেব আমাকে সঙ্গে নিয়ে চললেন। রাস্তায় আমাকে বললেন, সেখানে যা খেতে দেয় খাবেন,


কিছু বিষয় দেখবেন, কিন্তু কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করবেন না, কিছু কথা শুনবেন তা কারণ জানতে চাইবেন না। বাসায় ফিরে এসে আমার কাছে জিজ্ঞেস করবেন, আমি আপনার সব প্রশ্নের জবাব দেবো। বাসাটা ছিল জিনপরীদের। সেখানে এক জিনের সঙ্গে এক পরীর বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল। মুনশী সাহেব হলেন একজন জিন সাধক-জিনদের বাদশা। মিয়াজান মুনশীর আসল নাম কি তা কেউ জানে না, তবে কিছু লোকে তাকে ঐ নামে ডাকে, তাঁর আসল ঠিকানা কোথায় তা কেউ জানে না, তবে আমি তাকে যে বাসায় দেখেছি, ঐটি তার অনেক স্থানের অনেক বাসার একটি মাত্র।


মিয়াজান মুনশী শুধু জিন সাধক ও জিনের বাদশা নন। তিনি উচু স্তরের একজন আধ্যাত্মিক জ্ঞানের সাধক। কথা প্রসঙ্গে তিনি একদিন বলেছিলেন, অতি সাধারণ একজন মানুষ চাল, পানি, আগুন দিয়ে ভাত রান্না করতে পারে, কোনো কোনো মানুষ কখনো চাল, পানি আর আগুন ছাড়াই ভাত তৈরি করতে পারে বিশ্বাস করেন কি?

আমি মুনশী সাহেবের কথায় হ্যাঁ কি না কিছুই বলতে পারিনি। শুধু তাঁর চোখ মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।


মুনশী সাহেবের বাসায় কিছু দিন থেকে আমি বুঝতে পারলাম, তাঁর কাছ থেকে জানার অনেক কিছু রয়েছে। তিনি দেওবন্দ মাদরাসায় শিক্ষক নন, আগ্রার দাওয়াখানার হেকিমও নন। তিনি পৃথক একটি উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উস্তাদ।


একদিন তাঁকে আমার ব্যক্তিগত অবস্থার বয়ান করে বললাম, হুজুর, আমি দেওবন্দ মাদরাসার কোর্স শেষ করেছি, আগ্রায় হেকিমী ও ইউনানী চিকিৎসা শাস্ত্র অধ্যয়ন করে কিছু দিন উত্তাদের নির্দেশে রোগীদের চিকিৎসা করেছি। উস্তাদগণ আমার অভিজ্ঞতার উচ্চ প্রশংসা করে সার্টিফিকেট লিখে আমার হাতে দিয়েছেন। কিন্তু আমার এখন মনে হচ্ছে, আমি যেনো কিছুই শিখিনি-জানিনি। এখন আমাকে আপনি কিছু শিক্ষা দিন।


আর আপনি আমাকে 'আপনি' সম্বোধন না করে 'তুমি' বলবেন।


হুজুর কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন, বিজ্ঞানীরা যে বিজ্ঞান লিখেন সেই বিজ্ঞান শুধু পড়ে বিজ্ঞানী হওয়া যায় না। কোনো বিজ্ঞানীই শুধু বই পড়ে পড়ে বিজ্ঞানী হননি। পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নানা ভাবে বিষয় নিয়ে চিন্তা ও গবেষণা করতে হয়। তারপর কারো ভাগ্যে নতুন কিছু আবিষ্কারের হয় ভাগ্যে ঘটে। আল কুরআনে 'ইকরা' একটি শব্দ আছে। এই 'ইকরা' পাঠ করে কেউ সওয়াবের জন্য আর কেউ পাঠ করে নতুন কিছু আবিষ্কার করে ফেলে...


মুনশী সাহেবের বাসায় আমি থাকতে লাগলাম।


আস্তে আস্তে আমার ভেতরের দুর্বলতা, ক্ষুদ্রতা, সংকীর্ণতা, হিংসা, ক্রোধ, ঘৃনা, অহংকার কেমনে যেনো দূর হয়ে গেলো। আমি দারুণভাবে ভারমুক্ত হয়ে গেলাম। নিজকে একদম হালকা মনে হতে লাগলো। কখনো আমার এমন মনে হতো যে আমি ইচ্ছা করলেই বুঝি পাখির মতো আকাশে উড়তে পারবো, মাকড়সার মতো পানির উপর দিয়ে হেঁটে যেতে পারবো, আকাশের মেঘ টেনে হাতের কাছে আনতে পারবো এবং জলভরা ভারীমেঘ ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিতে পারবো। বিষধর সাপ আর হিংস্র বাঘের ভয় আমার মনে আর রইলো না।


একদিন হুজুরের কাছে আমার মনের এইসব এলোমেলো চিন্তার কথা বললাম। হুজুর বললেন, এ তো অস্বাভাবিক চিন্তা নয়। আশ্চার্য হবার ও কিছু নয়। তুমি কিছু করতে পারবে। মাহান আল্লাহতায়ালা তাঁর যাবতীয় সৃষ্টিকে মানুষের অধীন করে দিয়েছেন। মানুষের অধীন এই সৃষ্টি বস্তু গুলো মানুষের হুকুম মানবে না কেন?


পাথরে যদি আঘাত করো পাথর থেকে পানির ঝরণা ধারা প্রবাহিত হবে। ইতিহাসে এমন অসংখ্য ঘটনা রয়েছে।


এই পর্যন্ত বলেই হুজুর কথা বলা বন্ধ করলেন। আমি আর কিছু জিজ্ঞাস করার সাহস পেলাম না। কয়েক মাস পর হুজুর বললেন, দরবেশ তোমার কি বাড়ির কথা মনে পড়ে?

বললাম, জী হুজুর মনে পড়ে।


তুমি বাড়ি যেতে চাও?


হুজুর আমার জন্য অনেক দোয়া করে বিদায় দিলেন। আমার মন তাঁকে ছেড়ে আসতে চাইলো না। মনে মনে ভাবলাম যদি আরো কিছু দিন এই হুজুরের কাছে থাকতে পারতাম?

Powered by Blogger.

আসুন করনা সম্পর্কে সচেতন হই সুস্থ থাকি ।