প্রকৃত মনুষত্ব
পূর্বালোচনার উপসংহারে একথা বলা যায় যে মানুষ তার বিশেষ এলেম আর নিজস্ব কিছু গুণাবলী হাছিল করার দ্বারা সম্মান আর উচ্চ মর্যাদার অধিকারী হতে পারে।
যা হোক আলোচনা করছিলাম যে প্রকৃত অর্থে পৃথিবীতে মন্দ বা খারাপ জিনিষের প্রবনতাটাই অধিক। যা প্রকাশের জন্য কোন মেহেনতের প্রয়োজন হয়না। অপর দিকে সৎ ও ন্যায় পরায়নতা শ্রম আর কঠোর সাধনা ব্যতিরেকে অর্জন করা যায় না। এর জন্য অনেক দুঃখ কষ্ট সহ্য করতে হয়। শ্রম-সাধনা মেহেনত আর দুঃখকষ্ট ছাড়া যদি কল্যান সৎ ও ন্যায় পরায়নতা লাভ করা যেত তাহলে আমাদের সমাজে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, খানকাহ, আর তাবলীগ জমাতের কোন ইজতেমা ও কায়েম করা হতো না।
শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাই প্রমান করে যে মানুষ সৃষ্টিগত সত্ত্বা হিসাবে তার কোন কাবিলিয়্যাত বা যোগ্যতাই নেই বরং বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাকে তিলে তিলে মানুষ হিসাবে গড়ে তোলা হয়। দুনিয়াতে ভূমিষ্ট হওয়ার পর মানুষ এর মাঝে তার মনুষত্বভাব সৃষ্টি হয়। বাহ্যিক আকার আকৃতির দ্বারাই প্রকৃত মানুষ হওয়া বা বলা যায় না বরং স্বভাব গুণ আর উত্তম চরিত্রের অধিকারীকে প্রকৃত ভাবে মানুষ বলা হয়।
এ প্রসংঙ্গে মাওলানা রুমী (রহঃ) বলেন:
گر بصورت آدمی انسان بودی امحمد و بوجهل هم یکسان بودی
অর্থাৎ যদি মানুষের বাহ্যিক আকৃতির নাম ইনসান হতো তবে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আর আবু জাহেলের মধ্যে কোন পার্থক্য হতো না। বাহ্যিক আকৃতি তো উভয়ের একই ছিল। এতে বুঝা যায় স্বভাব চরিত্র আর গুনাবলীর দ্বারা প্রকৃত মনুষত্ব লাভকরা যায়। যদি বাহ্যিক আকৃতি সুন্দর হয় কিন্তু আভ্যন্তরীন দিকটা কুৎসিত অসম্পূর্ন ও নিষ্কর্মা হয় তবে এর দ্বারা কোন কাজ হবেনা। বরং এ অবস্থা সৃষ্টি হওয়া দোষনীয়, এর মধ্যে প্রশংসনীয় কোন বস্তুই বিদ্যমান নেই। আভ্যন্তরীন ভাবে খারাপ রেখে বাহ্যিক ভাবে সুন্দর করে সাজানোর প্রচেষ্টা করা দুর্গন্ধ নাপাক ময়লার উপর রুপার আস্তর লাগানোরই নামান্তর হবে। এর দ্বারা নাপাক বস্তুর পবিত্র হওয়াতো দূরের কথা রূপার আচ্ছাদনটাই অপবিত্র হয়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে যাবে। অনুরূপ ভাবে যদি কেউ উত্তম পোষাক পরিধান করে কিন্তু তার অন্তর নোংরামীতে পুতি গন্ধময় হয় তবে তার পোষাকের কারনে সে কোন সম্মান এর উপযুক্তও হবে না ও তার, গুনাবলীও বিন্দুমাত্র বৃদ্ধি পাবে না।
এরিস্টোটল (ARISTATOL) নামে একজন প্রসিদ্ধ দার্শনিক ছিলেন। দিনরাত গাছগাছালীর মূল অনুসন্ধান করে সেগুলির পরীক্ষা নীরিক্ষা চালাতেন। তিনি তার আপন কাজে এতই ব্যস্ত থাকতেন যে দিন রাতের কোন খবর থাকতো না। এক দিনের ঘটনা-সারাদিন ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হয়ে রাস্তার উপর নিদ্রাবিভূত হয়ে পরেন। ঘটনা ক্রমে ঐ দিনই রাজা রুহী সৈন্য সামন্ত নিয়ে সমভিব্যাহারে বেড়াতে বেরিয়েছেন। আরোহী দলের অগ্রবর্তী দূত ও ঘোষক রাজ্যের সমস্ত প্রজাদেরকে রাস্তা ছেড়ে যাওয়ার জন্য আওয়াজ দিচ্ছিল। কিন্তু আরাস্তু ঘুমে এতই বিভোর ছিলেন যে তিনি কিছুই টের করতে পারেন নাই। আর সাধারনত এমন লোকদের এসব ব্যপারে কোন চিন্তা ভাবনাও থাকে না।
বাদশাহ তার পার্শ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, তাকে ঐ অবস্থায় ঘুমাতে দেখে চলন্তাবস্থায় ক্রোধে একটি খোচা মারলেন। এতে তিনি জাগ্রত হয়ে বাদশাহকে বললেন বেআদব। বাদশাহ বললেন আরে বেআদব তুইকি আমাকে চিনিস? আমি কে? জবাবে আরাস্ত বললেন সম্ভবত আপনি বনের কোন হিংস্র প্রাণী বলে মনে হয় । । কেননা হিংস্র প্রাণী কেবল খোঁচা মেরে মেরে পথ চলে। তার অনভিপ্রেত অসামাঞ্জশ্য, অশালীন কথাশুনে বাদশাহর ক্রোধ আরো বেড়ে গেল।
বাদশাহ বললেন, বদ-তমীজ, আমি ধন-সম্পদ, সৈন্য-সামন্ত, দূর্গ, রাজপ্রসাদ, আর সিংহাসনের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তুই আমার সাথে এমন অশালীন আচরন করছিস। এরিস্টোটল বললেন এতসব যা কিছুর উল্লেখ করলে সবইতো বাহিরের বস্তুসমূহ। কিন্তু তোমার ভিতরে এমন কি গুনাবলী, সুন্দর আর উত্তম বস্তু রয়েছে? নিশ্চয়ই তুমি ভাল ভাবেই অবগত আছ যেদিন তোমার থেকে বাদশাহী আবরন ঘসে পড়বে সেদিন তুমি অপদস্ত হবে। তোমার অবস্থা সম্পর্কে পর্যোবেক্ষন করার মত কেউ থাকবেনা।
মানুষকে তো তার ভিতরগত বস্তুর জন্যে গৌরব করা উচিৎ। তোমার ভিতরে যখন ভাল কোন গুনাবলী নেই তখন তুমি পোষাক-পরিচ্ছদ আর সিংহাসনদ্বারা মর্যাদাশালী ও গুনাবলী সম্পন্ন হতে পারবেনা। বাদশাহী পোষাক ছেড়ে একটা সাধারন লুঙ্গী পরিধান করে চল আমরা উভয়েই নদীতে ঝাপিয়ে পরি তখন দেখা যাবে তুমিকে আর আমি-কে, তোমার মাঝে কি গুনাবলী আছে আর আমার মাঝে কি গুনাবলী আছে।
মোট কথা মানুষের বাহ্যিক আকৃতির নাম মানুষ নয়। মানুষ শুধু বাহ্যিক কারনে সম্মানীত ও গুনী হয় না। পোষাক পরিচ্ছদ বাহ্যিক একটি বস্তু মাত্র আর ধন সম্পদ তো আরো দুরের বস্তু। ঐ সমস্ত বস্তু দ্বারা গুনান্নিত হবার কোন যৌক্তিকতাই হতে পারেনা। আল্লাহপাকের সত্ত্বাই পরিপূর্ণ গুনাবলীর একমাত্র উৎস। আমাদের মাঝে যে গুনাবলী আসবে তা উৎসমূল থেকেই আসবে তার জন্য আল্লাহ পাকের নৈকট্য লাভ করা একান্ত প্রয়োজন। এবং একথা সর্বজনস্বীকৃত যে বিশেষ ভাবে প্রচেষ্টার মাধ্যমে নৈকট্য হাছিল করা যায়। চেষ্টা আর সাধনা যতই বৃদ্ধি পাবে নৈকট্য ও তদানুযায়ী তরাহ্নিত হবে। নৈকট্য যতই তরাহ্নিত ও বৃদ্ধি লাভকরবে গুনাবলীও আনুপাতিক হারে আসতে থাকবে। এবং তার বিপরীত দিক দিয়ে যতই দুরত্ব সৃষ্টি হবে সেই পরিমান গুনাবলীও হ্রাস পেতে থাকবে। মানব জীবনের চরমোৎকর্ষতা
