TjT

করনা প্রতিরোধে হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার মেনে চলুন। অপরিষ্কার হাত দিয়ে চোখ, নাক ও মুখ স্পর্শ্ করা থেকে বিরত থাকুন। অ্যালকোহল যুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার হাতের তালুতে নিয়ে ( 20 সেকেন্ড ) ভাল করে পরিষ্কার করুন। ব্যবহৃত টিস্যু ঢাকনা যুক্ত ডাস্টবিনে ফেলুন। পরিচিত বা অপরিচিত ব্যক্তির সাথে হাত মেলানো বা আলিঙ্গন করা থেকে বিরত থাকুন। আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকুন।

রাজনীতিতে মওলানা দরবেশ আহমদ

 রাজনীতি ইসলাম থেকে পৃথক কোনো বিষয় নয় বা ইসলাম রাজনীতি বাদ দিয়ে নয়। মওলানা দরবেশ আহমদ শিক্ষা, সমাজ সংস্কার এবং চিকিৎসা সেবার সঙ্গে দেশ ও জাতির কল্যানের স্বার্থে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন।


তখন দেশে উল্লেখযোগ্য যে কয়েকটি রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন ছিল সে গুলো হলো- ১. জাতীয় কংগ্রেস (১৮৮৫), ২. আনজুমান-ই-ইসলাম (১৮৫৫), ৩. মোহামেডান লিটারারি (১৮৩৩), ৪. ন্যাশনাল মোহামেডান এসোসিয়েশন (১৮৪৯), ৫. মোহামেডান ইউনিয়ন (১৮৯৩), ৬. মোহামেডান রিফর্ম (১৮৯৬), ৭. বেঙ্গল মোহামেডান এসোসিয়েশন (১৯০৬), ৮. ইন্ডিয়ান মুসলিম এসোসিয়েশন (১৯০৭), ৯. অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ (১৯০৬)।


১৯১৯ সালে মওলানা আবদুল বারী, হাকীম আজমল খাঁ (১৮৬৩-১৯২৮) ও বোম্বাইয়ের বিখ্যাত ব্যবসায়ী শেঠজান মুহাম্মদ ছোটানির উদ্যোগে খেলাফত কমিটি গঠিত হয়। লক্ষ্ণৌতে দেওবন্দ মাদরাসার আলিমগণ মুসলমানদের কাছে খিলাফত আন্দোলনের গুরুত্ব তুলে ধরেন।


খিলাফত কমিটির বহু শাখা গড়ে ওঠে। মওলানা আবুল কালাম আজাদকে সভাপতি এবং মওলানা আকরাম খাঁ কে সাধারণ সম্পাদক করে বঙ্গীয় প্রাদেশিক খিলাফত কমিটি গঠিত হয়। মওলানা মনিরুজ্জামান এছলামাবাদী সংগঠনের সহ-সভাপতি এবং মওলানা আবদুল মজিদ বক্স সহ-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। মওলানা দরবেশ আহমদ তৎকালে টাঙ্গাইল মহকুমার বর্তমান টাঙ্গাইল জিলার সভাপতি নির্বাচিত হন। ২২ নভেম্বর দিল্লিতে অনুষ্ঠিত প্রথম খিলাফত সম্মেলনে গান্ধী শ্রদ্ধানন্দ মালব্য প্রমুখ কংগ্রেস নেতারা যোগদান করেন। এরপর থেকে গান্ধীর মনে অসহযোগ আন্দোলনের চিন্তা দানা বাঁধতে থাকে। ১৯২০ সালে গান্ধী এক বিবৃতিতে বলেন যে, মুসলমানদের খিলাফত দাবী না মানলে দেশে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হবে। এরপর ১৭ এপ্রিল মাদ্রাজে অনুষ্ঠিত খিলাফত সম্মেলনে চতুর্মুখী অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি গৃহীত হয়। ১৯২০ সালের ৯ জুন কেন্দ্রীয় খিলাফত কমিটি ও কংগ্রেস নেতারা যৌথভাবে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন।


আন্দোলনের মূল কর্মসূচি ছিল সরকারি সম্মান ও খেতাব বর্জন, স্কুল, কলেজ ও আদালত বর্জন, বিদেশী পণ্য বর্জন, সরকারি চাকরিতে ইস্তফাদান, কর প্রদান বন্ধ এবং ব্যপক ভাবে আইন অমান্য শুরু। সারা দেশে আন্দোলন যখন তুঙ্গে সেই সময় ১৯২২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আন্দোলনকারীরা উত্তর প্রদেশের গোরক্ষপুর জিলার চৌরিচৌরায় একটি পুলিশ ফাঁড়ি আক্রমণ করে। এ সময় পুলিশ গুলি ছুঁড়লে উত্তেজিত জনতা ফাঁড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়। পুলিশ পালানোর চেষ্টা করলে জনতা তাদের ধরে কেটে টুকরো টুকরো করে আগুনে ফেলে দেয়। উত্তেজিত জনতার হাতে এ ভবে ২২ জন পুলিশ সদস্য প্রাণ হারায়। এই হিংসাত্মক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গান্ধী অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন।


অসহযোগ আন্দোলনের সময় করটিয়ার জমিদার ওয়াজেদ আলী খান পন্নী খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সি.আর দাশ আন্দোলনে নেমে এলেন। তাঁকে দাওয়াত করে করটিয়াতে সম্মেলনের আয়োজন করা হলো। করটিয়া ও টাঙ্গাইলের নেতা কর্মীরা সম্মেলন সফল করার জন্য কাজ শুরু করে দিলেন। মওলানা দরবেশ আহমদের নেতৃত্বে হিন্দু মুসলিম সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলেন। এদিকে সি. আর দাশের উপর ১৪৪ ধারা জারি করলেন সরকার। ফলে তিনি সম্মেলনে যোগদান করতে পারলেন না, যোগদান করলেন তাঁর স্ত্রী বাসন্তী দেবী। তিনি সভানেত্রী হলেন। বাসন্তী দেবীর সঙ্গে এসেছিলেন গায়ক হরেন ঘোষ। তিনি গাইলেন স্বভাব কবি গোবিন্দ দাশের গান


'স্বদেশ স্বদেশ করিস কারে


এ দেশ তোদের নয়।'


করটিয়া স্কুলের আরবী শিক্ষক মওলানা আহছান উল্লাহ খিলাফত সভা উপলক্ষ্যে একটি গান রচনা করেছিলেন। মওলানা সৈয়দ আমজাদ আলী তাঁর সে অনুপম কণ্ঠে পাগল হয়ে গাইলেন-


'তোমহারা ছুরয ডুবডুব হ্যায়


তভী তোমহারী খবর নাহি হ্যায়,


তখত তোমহারী উলট রহী হ্যায়


তভী তোমহারী খবর নাহি হ্যায়।'


শ্রোতারা গানে সুরে উদ্বেলিত হয়ে উঠলো। টাঙ্গাইল মহকুমার সভাপতি হিসাবে মওলানা দরবেশ আহমদ বক্তৃতা দিয়ে সবাইকে আন্দোলনে অনুপ্রাণিত করে তুললেন। আন্দোলনে অংশ গ্রহণের অপরাধে কারণে চাঁদ মিয়ার ২ বছরের কারাদণ্ড হয়। তাঁকে মোমেনশাহী জেল হতে আলীপুর সেন্টাল জেলে পাঠানো হয়। মওলানা দরবেশ আহমদ চাঁদ মিয়ার সঙ্গে আলীপুর সেন্টাল জেলের দরজা পর্যন্ত সঙ্গে থাকেন। উল্লেখ্য যে,

অসহযোগ আন্দোলনের সময় মওলানা দরবেশ আহমদের ভাতিজা আহমদ হাতেম আলী আসাম প্রদেশে সরকারি পুলিশ ইন্সপেক্টর চাকরিতে কর্মরত ছিলেন। মওলানা সেখানে গিয়ে তাঁকে চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে এনে ভাদুরির চর মাদরাসায় শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দান করেন।


এই অসহযোগ আন্দোলন ও বিদেশী পণ্য বর্জনের সময়ই মওলানা দরবেশ আহমদের ছোট মেয়ে ফাতেমা বেগমের বিয়ের দিন ধার্য হয়। বর পক্ষ বিদেশী কাপড় জুতোসহ নানা রকম জিনিস নিয়ে এলে মওলানা তাদেরকে বিদেশী পণ্য বাদ দিয়ে স্বদেশী পণ্য কিনে আনতে বলেন। বরের পিতা মওলানার প্রস্তাবে রাজি হন না এবং মওলানাও মেয়ে বিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানান। কিন্তু মেহমানদের ভালো করে খাইয়ে বরকে পালকীতে তুলে বিদায় করে দেন।


বরের পিতা চলে যাবার সময় বলেন, মওলানা সাহেব দেশের রাজনীতি তাঁর মেয়ের বিয়ের মধ্যে টেনে এনে ভলো কাজ করলেন না।


১৯২২ সালের ডিসেম্বরে গয়া কংগ্রেসের সভাপতি রূপে সি.আর দাশ কাউন্সিল এনট্রি প্রোগ্রাম পেশ করেন। কিন্তু আইন সভার প্রতিনিধি প্রেরণ সংক্রান্ত তাঁর প্রস্তাবটি অগ্রাহ্য হয়। এতে তিনি কংগ্রেসের সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ড. আনসারী তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। কংগ্রেস দেশ বন্ধুর প্রস্তাবে সায় না দিলেও বাংলার অধিকাংশ মুসলিম নেতার সমর্থনের আশ্বাস পেয়ে তিনি ১৯২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর সর্বভারতীয় ভাবে স্বরাজ পার্টি গঠনের কথা ঘোষণা করেন। ১৯২৩ সালের জানুয়ারিতে তা জন সাধারণের প্রচারিত হয়। দাশ স্বয়ং প্রেসিডেন্ট হন এবং সেক্রেটারি পদে নির্বাচিত হন মতিলাল নেহরু। ড. আনসারী, হাকীম আজমল খাঁ, বিরল ভাই প্যাটেল, মওলানা আকরাম খাঁ, মওলানা মনিরুজ্জামান এছলামাবাদী, মওলানা দরবেশ আহমদ, ডা. বিধান চন্দ্র রায় প্রমুখ নেতা দেশ বন্ধুকে সমর্থন করেন। আবুল মনসুর আহমদও স্বরাজ দলের সমর্থক ছিলেন। মওলানা এছলামাবাদী ও মওলানা দরবেশ আহমদের সমর্থন পেয়ে তিনি ঐ দলের পক্ষে কথা বলতে শুরু করেন।


১৯১৯ সালের শাসন সংস্কার আইন অনুসারে গঠিত বংগীয় প্রথম আইন সভার (১৯২১-


১৯২৩) মেয়াদ উত্তীর্ন হওয়ার পূর্বেই ১৯২৩ সালের ডিসেম্বরে দ্বিতীয় আইন সভায় (১৯২৪-১৯২৬) জন্য সাধারণ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়। এই নির্বাচন লগ্নে স্যার আবদুল রহীম, মৌলবী আবদুল করীম, মৌলবী মুজিবুর রহমান, মওলানা আকরাম খাঁ, মওলানা মনিরুজ্জামান এছলামাবাদী ও মওলানা দরবেশ আহমদ প্রমুখ মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ এবং মি. জে. এম সেনগুপ্ত, মি. শরৎ চন্দ্র বসু, মি. জে. এম দাশ, ডা. বিধান চন্দ্র রায় প্রমুখ হিন্দু নেতার সহযোগিতায় দেশবন্ধু ১৯২৩ সালের ৯ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক বেঙ্গল প্যাক্টে স্বাক্ষর করেন। ঐ চুক্তির শর্তাবলীর মধ্যে একটি ছিল এই যে, বাংলাদেশে মুসলমানাদের সংখ্যা ৫৫% তাই এই পরিমান চাকরি যোগ্য মুসলমান প্রার্থীদেরকে দিতে হবে। যতদিন মুসলমানরা ঐ সংখ্যায় উপনীত না হবে, তত দিন সরকারি চাকরির ২০% পাবে হিন্দু প্রার্থীরা এবং বাকী ৮০% পাবে মুসলমান যোগ্য প্রার্থীগণ। দেশ বন্ধু বঙীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটিকে দিয়ে ঐ প্যাক্ট মনজুর করিয়ে নেন। তখন প্যাক্ট বিরোধী নেতাগন বলতে লাগলেন, দেশবন্ধু স্বরাজ্য দল ও কংগ্রেস কমিটিতে প্যাক্ট পাস করতে পারলেও কংগ্রেসের প্রকাশ্য সম্মিলনে তা করতে পারবেন না। সেই উদ্দেশ্যে তিনি ১৯২৪ সালের ২রা জুন সিরাজগঞ্জে সম্মিলন আহ্বান করেন। এই সম্মিলন সফল করার জন্য মওলানা দরবেশ আহমদ এলাকার বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে বক্তৃতা দিয়ে জনমত তৈরি করেন। মওলানা আকরাম খাঁ ঐ প্রকাশ্য অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। দেশবন্ধু প্রাণস্পর্শী বক্তৃতা ও মওলানা আকরাম খাঁ সাহেবের সুললিত পান্ডিত্যপূর্ণ অভিভাষণ এবং অন্যদের হিন্দু মুসলমান ঐক্যের বাণী যাদুমন্ত্রের মতো কাজ করেছিল। এই সম্মিলনে মওলানা দরবেশ আহমদ এর সুললিত কণ্ঠের বক্তৃতা শ্রোতাদের অভিভূত করে। প্রায় সর্ব-সম্মতিক্রমে বেঙ্গল প্যাক্ট গৃহীত হয়। উক্ত আলোচনা থেকে এটা পরিস্কার ভাবে প্রতিভাত হয় যে, স্বরাজ্য দলের সমর্থন ও বেঙ্গল প্যাক্ট রচনায় মওলানা আকরাম খাঁ, মনিরুজ্জামান এছলামাবাদী, মওলনা দরবেশ আহমদ-এর মতো বড় বড় আলিমগণ সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন।


Powered by Blogger.

আসুন করনা সম্পর্কে সচেতন হই সুস্থ থাকি ।