৬ষ্ঠ দিনের তা'লীম সিয়াম ফরজ হওয়ার শর্তাবলী
ভ্রাতৃবৃন্দ। এখানে সিয়াম ফরজ হওয়ার শর্তাবলী ও হুকুম ও আহকাম সম্পর্কে আলোচনা করা হবে।
সিয়াম ফরজ হওয়ার শর্তসমূহ:
প্রথম শর্ত: মুসলিম হওয়া। সুতরাং অমুসলিমের উপর সিয়াম ফরজ নয়।
কুরআন-সুন্নাহ ও ইজমার দলিল মোতাবেক মাহে রমযানে সিয়াম ফরজ।
কুরআনের দলিল:
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنزِلَ فِيْهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ فَمَنْ
شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ. (بقرة: ١٨٥)
অর্থঃ রমযান মাস যাতে নাযিল হয়েছে মহাগ্রন্থ আল-কুরআন, যা বিশ্ব মানবতার জন্য হেদায়েত, সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা এবং হক ও বাতিলের মাঝে পার্থক্যকারী। যে এ মাস পাবে, সে যেন সিয়াম পালন করে। (বাকারা: ১৮৫)
সুন্নাহর দলিল:
إِذَا رَأَيْتُمُ الْهِلَالَ فَصُوْمُوا (متفق عليه)
অর্থঃ যখন তোমরা (রমযানের) চাঁদ দেখো তখন সিয়াম পালন কর।
(বুখারী ও মুসলিম)
ইজমার দলিল: সকল উলামায়ে কেরাম মুসলিমের উপর রমযানের সিয়াম ফরজ হওয়ার ব্যাপারে ইজমা বা ঐকমত্য পোষণ করেছেন।
কাফিরের উপর সিয়াম ফরজ নয় এবং কাফিরের সিয়াম সহীহ হবে না। কারণ সে ইবাদতের যোগ্য নয়। যদি সে মাহে রমযানের মাঝখানে মুসলমান হয়, তাহলে বিগত দিনগুলোর সিয়াম কাযা করা তার জন্য আবশ্যক নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
قُلْ لِلَّذِينَ كَفَرُوا إِنْ يَنْتَهُوا يُغْفَرْ لَهُمْ مَا قَدْ سَلَفَ (الأنفال - ۳۷)
অর্থঃ হে রাসূল! আপনি কাফেরদের বলে দিন, যদি তারা কুফুরী পরিহার করে ঈমানদার হয়ে যায়, তাহলে তাদের পূর্ববর্তী গোনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে। (আনফাল :৩৭)
যদি কাফির রমযানের মধ্যভাগে মুসলমান হয়, তাহলে বাকী দিনগুলোর সিয়াম পালন করা তার জন্য আবশ্যক। কারণ ইসলাম গ্রহণের পর থেকে সে ফরজ ইবাদতের যোগ্য হয়ে গেছে।
দ্বিতীয় শর্তঃ বালেগ হওয়া। সুতরাং নাবালেগের উপর সিয়াম ফরজ হবে না।
রাসূল (সা.) বলেছেন:
رُفِعَ القَلَمُ عَنْ ثَلاثَ عَنِ النَّائِمِ حَتَّى يَسْتَيْقِظَ وَعَنِ الصَّغِيْرِ حَتَّى يَكْبُرَ وَعَن
الْمَجْنُونِ حَتَّى يَعْقِلَ أَوْ يُفِيقَ. (أحمد، وأبو داود والنسائي)
অর্থঃ তিন ব্যক্তির জন্য কলমের লিখন বন্ধ রাখা হয়েছে। (বিধান শিথিল করা হয়েছে)
যথা: (১) ঘুমন্ত ব্যক্তি যতক্ষণ না জাগ্রত হবে, (২) নাবালেগ যতক্ষণ পর্যন্ত বালেগ না হবে এবং (৩) পাগল যতক্ষণ জ্ঞান ফিরে না পাবে। (আহমদ, আবু দাউদ, নাসায়ী, হাকিম)
কিন্তু সালফে সালেহীনের অনুকরণ ও অনুসরনে অভিভাবকগণ নিজ নাবালেগ সন্তানকে ইবাদতের চর্চা করাবে, যাতে বালেগ হওয়ার পর ঐ ইবাদত সহজ হয়।
সাহাবায়ে কিরাম (রা:) তাদের ছোট ছোট নাবালেগ সন্তানদের সিয়াম পালন করাতেন এবং মসজিদে নিয়ে যেতেন।
আজকের দিনে অনেক অভিভাক এ বিষয়ে গাফেল ও উদাসীন। তারা নাবালেগ শিশু সন্তানদের সিয়াম পালনের নির্দেশ দেন না। বরং তাদের আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও তাদের প্রতি করুণা বশতঃ সিয়াম পালনে নিষেধ করেন।
বাস্তব কথা হলো: ইসলামী মূল্যবোধ ও রীতি-নীতির উপর প্রশিক্ষণ দেয়াই হলো তাদের প্রতি করুণা প্রদর্শন। সুতরাং যে ব্যক্তি নাবালেগ শিশু সন্তানদের সিয়াম পালন থেকে নিষেধ করে সে বস্তুত: তাদের প্রতি করুণা করলো না।
হ্যাঁ। যদি নাবালেগ শিশুর সিয়াম পালনে ক্ষতি হয়, তাহলে নিষেধ করায় অসুবিধা নেই।
তিনটি বিষয়ের যে কোন একটির মাধ্যমে বালেগ প্রমাণিত হয়।
প্রথম: স্বপ্নদোষ বা বীর্যপাত হওয়া।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِذَا بَلَغَ الأَطْفَالُ مِنْكُمُ الْحُلْمَ فَلْيَسْتَاذِنُوا كَمَا اسْتَأْذَنَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ (النور:
(٥٩)
অর্থঃ তোমাদের সন্তান বয়ঃপ্রাপ্ত হলে, তারাও যেন অনুমতি নেয় যেমনিভাবে তাদের পূর্ববর্তীরা অনুমতি নিয়েছিল। (আন-নূর: ৫৯)
রাসূল (সাঃ) বলেছেন:
غُسْلُ الْجُمُعَةِ وَاجِبٌ عَلَى كُلِّ مُحتلم (بخاري، مسلم)
মুসলিম) অর্থঃ প্রতিটি বালেগের জন্য জুমআর দিন গোসল করা ওয়াজিব।' (বুখারী
দ্বিতীয়: নাভীর নিচে পশম গজানো।
এ ব্যাপারে আতিয়া কুরাজী (রা:) বলেন, যুদ্ধের দিন আমাদের বন্দি করে রাসূল (সা.) এর নিকট উপস্থিত করা হয়েছিল। যারা বালেগ ছিল কিংবা যাদের নাভীর নিচে পশম গজিয়েছিল, তাদের হত্যা করা হয়েছিল। অন্যদের ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। (আহমদ, নাসায়ী)
তৃতীয়: ১৫/১৮ বৎসর বয়সে উপনীত হওয়া।
এ ব্যাপারে আব্দুল্লাহ বিন উমর (রা:) বলেন, "আমি নবী (সা.) এর নিকট উহুদ যুদ্ধের দিন নিজেকে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য পেশ করলাম। আমার বয়স তখন ১৪ বৎসর ছিল। তিনি তখন আমাকে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি দেন নি।"
ইমাম বায়হাকী ও ইবনে হিব্বান সহীহ গ্রন্থে বিশুদ্ধ সনদে বর্ণনা করেন: আব্দুল্লাহ বিন উমর (রা.) বলেন, আমি যখন ১৪ বৎসরের বালক ছিলাম, তখন রাসূল (সা.) আমাকে উহুদ যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি দেন নি। কারণ তিনি আমাকে তখন বালেগ মনে করেন নি। এর পর আমি রাসূল (সা.) এর নিকট নিজেকে খন্দক যুদ্ধের জন্য পেশ করলাম, তখন আমার বয়স ১৫ বৎসর। সে সময় তিনি আমাকে যুদ্ধের অনুমতি দিলেন, কারণ সে সময় তিনি আমাকে বালেগ হিসেবে গণ্য করেছেন। (একদল হাদীস বিশারদ বর্ণনা করেছেন)
নাফে' (রহ:) বলেন, তারপর আমি উমর ইবনে আব্দুল আযীয (খলীফাতুল মুসলিমিন) এর নিকট আগমন করে এ হাদীসটি বর্ণনা করলে তিনি কর্মচারীদের নিকট লিখলেন: তারা যেন বালেগ হওয়ার বয়স ১৫ বৎসর ধার্য করে। (বুখারী)
আর মেয়েদের বালেগা হওয়ার আলামত উপরোক্ত তিনটি। চতুর্থটি হলো:
হায়েজ বা ঋতুস্রাব হওয়া। যখন মেয়েদের হায়েজ হয়, তখন শরীয়তের যাবতীয় নির্দেশ পালন আবশ্যক। যদিও বয়স ১৫ বৎসর না হয়। যদি কেউ রমযান মাসের দিনের বেলায় বালেগা হয় তাহলে বাকি দিন পানাহার থেকে বিরত থাকবে। কারণ সে সিয়ামের যোগ্য হয়েছে।
তৃতীয় শর্ত: জ্ঞান সম্পন্ন হওয়া। সুতরাং পাগল, অচেতন, মাতালের উপর
সিয়াম ফরজ নয়।
দলিলঃ রাসূল (সা.) এর বাণী, رُفِعَ الْقَلَمُ عَنْ ثَلَاثٍ
অর্থঃ তিন ব্যক্তির উপর থেকে লিপিবদ্ধকরণ তথা শরয়ী বিধান শিথিল করা
হয়েছে।" পাগল বা উন্মাদ তাদের অন্যতম।
পাগল যদি সিয়াম পালন করে তাহলে তা সহীহ হবে না। কারণ পাগল ইবাদত বুঝে না, নিয়ত ও বুঝে না। অথচ নিয়ত ছাড়া ইবাদত বিশুদ্ধ হয় না।
রাসূল (সা.) বলেছেন: إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَات "সমস্ত কাজের ফলাফল নিয়তের উপর নির্ভরশীল।" (বুখারী ও মুসলিম,)
যদি কখনও পাগলামী করে আবার কখনো সুস্থ হয়, তাহলে পাগলামী অবস্থা ছাড়া সুস্থ অবস্থায় সিয়াম পালন করা অবশ্যক। যদি দিনের মধ্য ভাগে পাগল হয়ে যায়, তাহলে তার সিয়াম বাতিল হবে না। যেমনিভাবে কেউ অসুস্থ বা অন্য কোন কারণে জ্ঞান হারিয়ে ফেললে তার সিয়াম ভঙ্গ বা বাতিল হয় না। কারণ সে সিয়ামের নিয়ত করেছে সুস্থ ও জ্ঞান থাকা অবস্থায়।
যদি নির্দিষ্ট সময়ে পাগলামী শুরু হয় আর তা জানা থাকে, তাহলে সিয়াম বাতিল হবে না। এক্ষেত্রে যেদিন পাগলামী করেছে ঐ দিনের সিয়াম কাযা করা আবশ্যক নয়। পাগল যদি রমযান মাসে দিনের বেলায় সুস্থ হয়, তাহলে বাকি দিন তার জন্য সিয়াম পালন আবশ্যক। কারণ সে সিয়াম পালনের উপযুক্ত।
চতুর্থ শর্ত: সুস্থ হওয়া। কারণ ভালো-মন্দ নির্ণয়ের জ্ঞান না থাকলে শরয়ী বিধান পালনের যোগ্য হয় না।
পঞ্চম শর্ত: সিয়াম পালনে অক্ষম না হওয়া। এ অক্ষমতা যদি সার্বক্ষনিক থাকে, যা দূর করা অসম্ভব। যেমন-বয়স্ক ব্যক্তি, এমন রুগ্ন ব্যক্তি যার আরোগ্য হওয়ার আশা করা যায় না (যেমন: ক্যান্সার বা অনুরূপ' রোগ)। এমন অক্ষম ও রুগ্ন ব্যক্তির উপর সিয়াম ফরজ নয়।
মহান আল্লাহ বলেছেন:
فَالْقُوَ اللَّهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ (التغابن : ١٦)
অর্থঃ সাধ্যমত তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। (তাগাবুন: ১৬)
অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
لا يُكَلِّفُ اللهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا. (البقرة: (٢٨٦)
:২৮৬) অর্থঃ আল্লাহ সাধ্যের বাইরে কাউকে দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না। (বাকারা
তবে অক্ষম ব্যক্তির জন্য প্রতি সিয়ামের পরিবর্তে প্রত্যহ একজন মিসকীনকে খানা খাওয়ানো ওয়াজিব।
সুতরাং সিয়াম পালনে অপারগ ব্যক্তির জন্য সিয়ামের পরিবর্তে খাদ্য দানের বিধান প্রমাণিত হল।
আবার সব মিসকিনকে দাওয়াত করে নির্ধারিত দিনের হিসাব অনুযায়ী খাওয়ানো যেতে পারে। ইমাম বুখারী (রহ.) বলেছেন: বয়োবৃদ্ধ লোক যখন সিয়াম পালনে অক্ষম হবে, তখন আনাস (রা.) এর পদাঙ্ক অনুসরন করবে। আনাস (রা.) বৃদ্ধ হবার পর এক বৎসর কিংবা দু'বৎসর প্রত্যেক দিন একজন মিসকীনকে রুটি ও গোসত খাওয়াতেন এবং সিয়াম ভাঙ্গতেন।
ইবনে আব্বাস (রা.) বৃদ্ধ পুরুষ ও বৃদ্ধা নারীর ব্যাপারে বলেছেন, যারা সিয়াম পালনে অক্ষম, তারা প্রতি সিয়ামের পরিবর্তে একজন মিসকীনকে খানা খাওয়াবে। (বুখারী)
বন্ধুগণ! শরীয়ত মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে হিকমত ও রহমত স্বরূপ। আল্লাহ এর দ্বারা বান্দাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। কারণ এটা সহজ-সরল ও বরকতময় শরীয়ত। আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক উপযুক্ত ব্যক্তির অবস্থানুযায়ী সিয়াম ফরজ করেছেন। যাতে প্রত্যেকেই নিজ নিজ কার্য আঞ্জাম দিতে পারে এবং এর দ্বারা প্রশান্তি লাভ করে।
হে আল্লাহ! আমরা আপনার কাছে প্রার্থনা করছি। কেননা আপনি এক ও অদ্বিতীয়, আপনি অমুখাপেক্ষী পূত-পবিত্র, আপনার কোন সন্তান নেই এবং আপনি কারও সন্তান নন। আমাদের আমৃত্যু ঈমান ও দ্বীনের উপর অটল ও অবিচল রাখুন।
হে মহিমান্বিত নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সৃষ্টিকর্তা। হে চিরঞ্জীব। আপনার সন্তুষ্টি অনুযায়ী জীবন যাপনের তাওফিক দিন এবং ইসলামকে মনোনীত দ্বীন ও মুহাম্মাদ (সা.) কে শ্রেষ্ঠ নবী হিসেবে আন্তরিকভাবে গ্রহনের তাওফিক দিন। আমাদের জীবনের সমুদয় পাপরাশিকে আপনার অপার কৃপা ও রহমতে ক্ষমা করুন। কেননা আপনি দয়াময় ও করুনাময়। দরূদ, সালাম ও শান্তি বর্ষণ করুন রাসূল (সা.) এবং সাহাবী (রা.) ও শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত যারা এ মহা সত্যের অনুসারীদের উপর। আমীন।
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوْبُ إِلَيْكَ

No comments