সন্ধ্যালোকে উড়ে যায় ঝরাপাতা
দীবার সেলসেটটার আওয়াজ খুব মিষ্টি, অনেকগুলো রিংটোনের মধ্য থেকে এই ঝিলিমিলি টুং- টুং আওয়াজকে বেছে নিয়েছে। আওয়াজটা গুনলে মনে হয় অনেকগুলো শ্বেতশুভ্র কাঁচের বাটিতে মেপে মেপে জল রাখা আছে। কোন এক উপত্যকার উপর বসে নিপুণ হাতে দক্ষ শিল্পী আপন মনে বাজাচ্ছে জলতরঙ্গ। কোনো কল এলে দীবা অনেকক্ষণ বাজতে দেয়, অপেক্ষায় যিনি থাকে তিনি শুনতে পান কুল কুল রবে বয়ে যাওয়া ঝরনাধারার মতো সংগীত। মন খারাপ নিয়ে কেউ ফোন করলে তারও মনটা ভালো হয়ে যায়। সংগীতের প্রভাব কেউ অস্বীকার করতে পারে না। বস বা মায়ের ফোন হলে ভিন্ন কথা। যখনই স্ক্রিনে এই দুটো নাম ভেসে ওঠে তক্ষুণি সেলফোন ওপেন করে।
খরতাপের দুপুরে দীবার বাজনাটা ভালো যায়। এখন খরতাপের দুপুর নয়। ছুটির অলস আপন দিন। জম্পেশ ভূরিভোজের পর ঘুমিয়েছিল। দুপুরে ঘুমানোর অভ্যাস ওর ছিল না। ঘুম নয় বিছানা আঁকড়ে পড়ে ছিল। এভাবে আরো কিছুক্ষণ থাকতে পারত, কেউ যদি বিরক্ত না করত। কিন্তু এখন নিজেই বিরক্ত হচ্ছে শখের বাজনাদার যন্ত্রটার উপর। অলস হাতটা বাড়িয়ে যন্ত্রটা ধরতে ইচ্ছে করছে না।
একটা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার মাঝামাঝি পর্যায়ের জুতসই পদবিতে চাকরি করে দীবা। ওদের সংস্থার কার্যক্রম দেশের তৃণমূল শ্রেণী পেশার মানুষের সাথে সম্পৃক্ত। ছুটিছাঁটা এমনিতে কম। তদুপরি জাতীয় দিবস, বিশেষ দিবসগুলো ছুটির দিনগুলোতে পড়ে তবে ছুটির কপালে ঝাঁটা। অফিসিয়ালিই পালন করতে হয়। গোলটেবিল, সেমিনার, র্যালি এমনি ধারার কতশত আয়োজন।
এত কাজের চাপ তবুও দীবার কোনো অভিযোগ নেই। ও বেশ উপভোগ করে এই কাজগুলো। কত ধরনের মানুষ কতশত আকারের চিন্তা, কত সিদ্ধান্ত সবাই সবার মতো করেই ভাবে, অভিন্ন বিষয়ে ভাবনা ভিন্ন।
এই তো পেরিয়ে গেল নারীদিবস। ওরা গিয়েছিল বরিশালের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে। সবুজ এই গ্রামটা এখনও সভ্যতা ও শিক্ষার আলোবঞ্চিত। নারীর অধিকার বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে তৃণমূলের নারীদের সাথে কথা বলে তো দীবা অবাক- একই দেশের দুই প্রান্তের দু'জনের এত ফারাক। অজ্ঞতা ও অভ্যাস ওদের কোন দুনিয়ায় ফেলে রেখেছে। বাল্যবিবাহের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত নারী নিজেকে আবিস্কার করতে পারে না। হিরন্ময় যৌবন ওদের হয় না। অধরাই থেকে যায়।
কাজী অফিসে দু'পক্ষের অভিভাবকের সম্মতিতে হয়ে যায় বিয়ে কনের অজান্তে।
স্বামী নামক পদার্থকে দেখতে পায় বাসর যাপনেরও তিন-চারদিন পর দিনের আলোতে। কারো বিয়ের রেজিষ্ট্রেশন ও হয় না। মতামত প্রকাশের কোনো প্রকার সুযোগ নেই। জীবনসাথী পছন্দের সাহস বা স্বাধীনতা তো এদেশের অনেক শিক্ষিত নারীরও নেই। এই যাঁতাকলে চাপা পড়া কোন রমণীর সোচ্চার কণ্ঠ ওকে অবাক করে দেয়, খোদ রাজধানীর বিখ্যাত নারীনেত্রীদের কণ্ঠও হার মানাতে পারে এদের উচ্চকিত কণ্ঠ, বোধ, বিবেচনা, ব্যাখ্যা। নিজের ভেতরই ওরা ফুঁসে উঠছে বৈপরীত্যের বিরদ্ধে। পাচ্ছে না ওদের বিদ্রোহ গলিত লাভার মতো প্রবাহিত করার রাজপথ।
সফেদ জল আর রেশমি বালুচর পাড়ি দিয়ে অনেক দুর্লভ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে যা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয়নি।
জলতরঙ্গ আওয়াজটা হচ্ছে তো হচ্ছেই। বেডসাইড টেবিল থেকে দানবীয় যন্ত্রটা তুলে আনে।
হ্যালো।
ঘুমের চেয়েও আলস্য মেখে আছে শব্দে
সন্ধ্যে হয়ে এলো, এখনও ঘুমাচ্ছ।
এক ঝটকায় বিছানায় বসে পড়ে। মুহুর্তেই সামলে নেয়।
নম্বর কোথায় পেলে?
: তুমি এখন সেলিব্রেটি। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো চ্যানেলে তোমাকে দেখা যায় সংবাদের চিত্ররূপে। মেয়ে মানুষদের নিয়ে অনেক কিছু করার বড় বড় কথা বলছ। নেত্রী হয়ে যাবে তো।
কোনো কথাই ভালো লাগে না দীবার, লাইনটা কেটে দিতে চায়। পরক্ষণেই ওকে শুধরে দেয়।
মানুষের জন্য কাজ করছি। নারী বা পুরুষ আলাদা করে নয়, সুবিধাবঞ্চিতদের নিয়ে কাজ করছি। মেয়ে মানুষ শব্দটা কোনো শিক্ষিত লোক বলে না। শোনো, বড় বড় কথা বলছি না, কাজ করছি নেত্রী হবার জন্য নয়।
ওরে বাবা, আমার জান দেখি অনেক কথা শিখে গেছে।
তোমার জান?
: তুমি তো আমার জান।
:
তাই!
খুব রেগে আছ আমার উপর?
রাগ!
: তাহলে কি ঘৃণা? সে তুমি করতেই পারো। আমি তোমার সাথে কিছু কথা বলতে চাই।
বলো।
: সামনাসামনি বলতে চাই। প্লিজ সোনা না করো না।
কি কথা দীবার সাথে আসিফের! সব কথা তো শেষ হয়ে গিয়েছে পাঁচ বছর আগের কোন এক শেষ বিকেলে। দীবার মাষ্টারস পরীক্ষা শেষ হবে, যেদিন আসিফ আসবে কথা বলবে মা-ভাইয়ার সাথে। কথা অনুযায়ী দীবা দাঁড়িয়ে ছিল আসিফের অফিসের সামনে। সেল ফোনের এমন জোয়ার সে সময় ছিল না। সামনের ফোন-ফ্যাক্সের দোকান থেকে ফোন করে দীবা, যা বলার আসিফের কলিগ বিস্তারিত বর্ণনা করে।
বাড়ি ফিরে গুনে ভাবী পড়ন্ত দুপুর আর বিকেল জুড়ে বাহারি নাস্তার আয়োজন করেছে একতোড়া তাজা ফুলও সাজানো ড্রইং রুমে শোভা বাড়িয়েছিল সেদিন।
: হ্যালো জান, কথা বলছ না কেন? আসো, প্লিজ আসো একটু আসো।
দীবা সরাসরি না করতে পারে কিন্তু তাতে সমাধান হবে না। রান্নাঘরে ভাবীর আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। মা মনে হয় দরজার সামনে থেকে ঘুরে গেল। চৌদ্দশ' স্কয়ার ফিটের এইটুকুন একটু ফ্ল্যাট। হ্যা-না, এসবের বেড়াজাল ভেঙে কারো না কারো কানে যাবেই। এই রিস্কটা আর নেবে না দীবা। ওদের নিস্তরঙ্গ স্নিগ্ধ টলটলে জলের দীঘির মতো সংসারটায় আবার যন্ত্রণার ঢিল ছুঁড়ে অশান্তির আর চাপা মনোকষ্টের তরঙ্গায়িত হবে আসিফের যে কোন খবরে।
কোথায় কখন?
রোকেয়া হলের সামনে ঠিক পাঁচটায়।
আসিফকে ভূলতে কি না করেছে দীবা। কত রাত যে না ঘুমিয়ে আকাশের তারা শুনে কাটিয়েছে, ওর প্রিয় খাবারগুলো সরিয়ে নির্জলা উপোষ দিত। বুকজুড়ে বিশাল পাথরটা জানিয়ে দিত আসিফ প্রতারক। প্রিয় শহরটাকে অসহ্য মনে হতো। জেলা শহরের কলেজে চাকুরি নিয়ে বসবাসের অযোগ্য এই শহর ছাড়ে। কচি কচি ছাত্রছাত্রী, টাঙ্গাইল শহর ও কলেজের পরিবেশ খুব ভালো লেগেছিল। শুধু গভীর রাতে বাড়িওয়ালার ছেলে দরজায় টুক টুক আওয়াজ করতো অসহায় পরিস্থিতি থেকে উদ্ধারের জন্য প্রার্থনা করত মনে মনে। দিনের আলোতে ছেলেটির ভয়মিশ্রিত কামুক দৃষ্টি উপেক্ষা অনেক সহজ ছিল।
ছুটিতে ঢাকা এলে এই চাকরি। ওদের প্রোজেক্ট সারাদেশে থাকলেও দীবা হেড অফিসে বসে। অবশ্য মাসের ট্যুর থাকে দশ-পনের দিন। সঙ্গে গাড়ি থাকে।
ড্রাইভার বাড়িওয়ালার ছেলের মতো পুরুষ হলেও পদবির গুণে তার পৌরুষ অবদমিত থাকে। আর সাথের পুরুষ সঙ্গী ড্রাইভারের সামনে ব্যক্তিত্ব বর্জনের ভয়ে ভদ্র থাকে। এখানকার পরিবেশ মোটামুটি নিরাপদই আছে। দুএকজন পুরুষ কলিগ দীবার সামনে নারীদের নিয়ে এমন সব অশ্লীল বাক্য বলে যা শুনলে অবাক হয় দীবা। অবশ্য অর্ক চৌধুরীর কথা ভিন্ন। তিন বছরের অধিক সময় ধরে কাজ করছে দুজন একসঙ্গে। প্রত্যেকটা বিষয়ে কি চুলচেরা বিশ্লেষণ। নির্ভুল সিদ্ধান্ত, পরিচ্ছন্ন কাজকর্ম। অমায়িক ব্যবহার। নারীদের প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধা, মমত্ব, ভালোবাসা। সবচেয়ে বড় গুণ... যোগ্যতার প্রশ্নে নারীদের যথাযথ মূল্যায়ন।
দীবার কল্পনায় পাঁচ বছর পার হতে সময় নেয়, ওর তৈরি হবার সময়টুকু।
:
কি রে তুই না বললি আজ বেরুবি না?
গলায় কালো মালা ঝুলাতে ঝুলাতে দেখে মা দরজায়।
এখুনি চলে আসব। রাতে ঝাল করে লইট্যা শুটকির ভর্তা, বেগুন ভাজা করবে বুঝলে! পেট ভরে ভাত খাব।
সে করা যাবেখন। অর্ক ফোন করেছিল।
কখন?
তুই ঘুমাচ্ছিলি। তাই ডাকতে মানা করেছে। বিকেলে আসবে, আমাদের সাথে কথা বলবে।
মা তুমি ভুলে যাও অর্করা পুরুষ।
:
এতদিন একসাথে কাজ করেও চিনতে পারলি না?
: মানুষ চেনা খুব কঠিন মা।
:
ঠিক কথাই বলেছিস রে, মানুষ নারী বা পুরুষ বলে কথা নয়, অন্যায় করে যে সেই অন্যায়কারী। অন্য কেউ নয়। তার দায়ভার জাতি কেন বহন করবে!
হেসে ফেলে দীবাও। নিজে নারী-পুরুষের মধ্যে প্রভেদ খুঁজছে, মানুষের স্বাভাবিক আচরণে। অথচ তার আগের প্রজন্মের মা লিঙ্গ বৈষম্য মানছে না আচরণ বিধিতে। মায়ের আধুনিক চিন্তা-ভাবনার পরিচয় দীবা বহুবার পেয়েছে।
ননদিনী অর্ক বিকেলে আসবে।
ভাবী থুতনিতে আঙুল ছুঁইয়ে সামনে দাঁড়ায়। সারাটা দুপুর পার করেছ রান্নাঘরে।
ভাবী কেন যে কষ্টকে ডেকে আনো।
দীবার নরম কথাগুলোর মধ্যে কতটা শ্লেষ ঝরছে বুঝতে পারে নাজলী।
দুঃখিনী মেয়েটার একরৈখিক সংগ্রামী পিঠের দিকে তাকিয়ে থাকে নাজলী। আহা, মেয়েটা মাখন-মসৃণ একটা জীবন পাক। আঁচল ভরে উঠুক সোনালি আলোতে।
ছুটির দিনের ফাঁকা রাস্তা, ত্রিশ মিনিটে পৌঁছে যায় গন্তব্যে। হাত উল্টে রিষ্ট ওয়াচ দেখে। দশ মিনিট দেরি হয়েছে। দেরিতে ভ্রুক্ষেপ করে না। হিসেবে মেলায় দশ ইন টু পাঁচ বছরে দুই মিনিট। খুব কি বেশি।
অর্ক বলে দীবা হিসেব করে পা ফেলে। হিসেব কি সাধে করে! ট্যাক্সিক্যাবের ভাড়া মেটাতে মেটাতে অর্কের মুখটা মনে করে নিস্পৃহভাবে। পেছন ফিরে তাকাতেই আসিফের ভূঁড়িতে দৃষ্টি আটকে যায়। শার্টের বোতাম ছিঁড়ে তেলাল মাংস বেরুতে চাইছে বিকেলের আলোতে। চুল ঝরে গিয়ে চমড়া দেখা যাচ্ছে। গাল দুটো পাঙ্গাস মাছের পেটির মতো তেল চকচক করছে।
२
এই খানে বসবে না অন্য কোথাও?
ছুটির বিকেলেও ছেলেমেয়ে থই থই করছে টি.এস.সি-তে। ওদের থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে আসিফের দিকে তাকায়।
এই একটু নিরিবিলি।
হয় নিয়তি, পাঁচ বছর আগের আসিফ দীবার কাছে একটু নিরিবিলি চাইছে। সামনে পা বাড়ায়। চারুকলাকে পেরিয়ে যায়। আসিফ রিকশা নিতে চেয়েছে। নাকচ করে দেয় অবলীলায়। হাঁটতে হাঁটতে দীবা খেয়াল করে আসিফের দৃষ্টি ওর বিশেষ বিশেষ অঙ্গের ভঙ্গি খুঁজে ফিরছে। রিকশার প্রস্তাব নাকচ করাটাকে সঠিক বলেই মনে হয়। হাত উঁচিয়ে ক্যাব ডেকে উঠে পড়ে দু'জন।
আধো আলো-আঁধারীতে দুজন মুখোমুখি হয়। আসিফ স্যুপ তুলে দেয় দীবার বাটিতে।
বিরাট ভুল হয়ে গেছে বুঝলা দীবা। বিরাট ভুল। বাবার ব্যবসা, বাড়িঘর, দুইটা বাচ্চা সামলে সামিয়া আমার দিকে তাকানোর সময়ই পায় না। বুঝলে না পয়সাওয়ালা ঘরের দেমাগী মেয়ে তো গরিব স্বামীকে পাত্তাই দিতে চায় না।
ব্যবসা, বাড়িঘর, বউ-বাচ্চা-তার মানে তোমার লাইফ কিন্তু নিরাপদ।
তা তো বটেই তবে সুখ নাইরে। ভালোবাসা নাই।
ছাড়া জীবন সত্যিই অচল।
খোঁচাটা গায়ে মাখে না আসিফ।
দীবা তোমাকে আমি ভালোবাসি।
: ভালোবাসা?
হ্যাঁ দীবা, ভালোবাসি। শুধু মায়ের পীড়াপীড়িতেই বিয়ে।
: তাহলে ভালোবাসা?
প্লিজ দীবা তর্ক করো না। শোনো খোলাসা করে বলি, তুমি আমার কাছে যেমন ছিলে এখনও তেমনি আছ, মানে তোমার তো বিয়ে হয়নি। চাকরি করছ। স্বাধীন। বয়সতো হয়েছে, এটা তো মানবে!
হ্যাঁ হ্যাঁ বলো, পরিস্কার করে বলো কি বলতে চাইছ।
আমি এখন থেকে ঢাকা থাকব। বাসা নিয়েছি। একাই থাকব। ছুটছাটায় যাব।
মানে বুঝতে পারছ তো ফাঁকা ফ্ল্যাট। তোমারও তো কিছু চাওয়া পাওয়া আছে, এখনও বিয়ে হয়নি। মানে পুরুষের সঙ্গ পাওনি। এমন তো কতই হচ্ছে। হচ্ছে না। কেউ জানতেও পারবে না বিশ্বাস করো।
বেহায়ার মতো হাসিতে উপচে পড়ছে পাঙ্গাস গাল দুটো। দীবার সমস্ত শরীর ঘিনঘিন করে ওঠে। ওর মনে হচ্ছে আসিফের সমস্ত শরীর জুড়ে বমি করে ভাসিয়ে দেয়। নিজেকে সামলে নেয়। ব্যাগের চেন খুলে একশত টাকার কড়কড়ে পাঁচটি নোট টেবিলে রেখে দেয়। সবার অলক্ষ্যে এক দলা থুথু ছুঁড়ে মারে আসিফের চকচক গালে। হন হন করে পিঠ সোজা রেখে বেরিয়ে পড়ে।
একটু তড়িঘড়ি ফিরতে হবে। অর্ক আসবে ছু'টায়। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে সাড়ে ছ'টাবাজে, বাসায় ফিরতে আরো ত্রিশ মিনিট। খুব বেশি দেরি হয়ে যাবে কি? অর্ক! অর্ক! অর্কের সাদা ধবধবে দাঁতের হাসি খুব মনে পড়ছে।
প্রকৃতিতে চলছে এখন হেমন্তকাল। খুব অল্পতেই দিন ফুরিয়ে যায়। শহর এখন সন্ধ্যার দখলে। শহর জুড়ে জ্বলে উঠেছে বাতি। শহরের দিকে তাকালে মনে হয় কালো জর্জেটে সোনালি জরি চুমকির কারুকাজ করা শাড়িতে সেজেছে বাড়ির সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটি। আজ হয়তো পূর্ণিমা। হালকা কুয়াশায় মাখা আকাশে বড়সড় চাঁদ ওঠার আয়োজন চলছে। সিগন্যালে আটকে যায় গাড়ি। চকচকে রঙের মলিন ময়লা কাপড় পরা ঠোঁটে কড়া লিপস্টিক মেখে একজন মেয়ে গাড়ির সামনে দিয়ে দৌড়ে রাস্তা পার হয়। এই মেয়েদের একটা বিশেষ নামে ডাকে। সারা ব্যাকরণ বই ঘেটেও এর পুংলিঙ্গ বের করতে পারেনি দীবা। একটু আগেই তো দীবা সেই পুংলিঙ্গের দেখা পেয়েছে। বইতে কি আর সব থাকে যা থাকে চারপাশে! শালা পুরুষ বেশ্যা! মনে মনে শব্দটা উচ্চারণ করতে পেরে খুব ভালো লাগছে।
ওর বুকে এখন এতটুকু আনুসূচনা নেই, ক্ষোভ নেই, হাহাকার নেই, কান্না নেই। সবুজ মাঠে যেমন হুহু করে হিমেল হাওয়া বয় তেমনি। ঝরা পাতা উড়িয়ে নিয়ে যায়। মা ঠিকই বলে একজন নারীর কারণে যেমন সমগ্র নারী জাতিকে দায়ী করা ঠিক নয়, তেমনি একজন পুরুষের অপরাধের দায় কেন বহন করবে সমগ্র পুরুষ জাতি!
সবুজ বাতি জ্বলে ওঠে। দীবার গাড়ি চলতে শুরু করে অর্কের উদ্দেশ্যে। পেছনে পড়ে থাকে আসিফ আঁকা ঝরাপাতা...
