ভাদুরিরচর মাদ্রাসা স্থাপন
ভাদুরিরচর মাদ্রাসা স্থাপন
মওলানা দরবেশ আহমদ ভাদুরির চর গ্রামে মাদরাসা স্থাপনের উদ্দেশ্যে পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন। উক্ত গ্রামের লোকজনকে সভায় কথা জানানোর জন্য ইমামগণ মসজিদের নামাজের পর এলার্ম করে দিয়েছিলেন। সভার দিন অলোয়া, নিকলা, ছাব্বিশাসহ কয়েক গ্রামের মাতাব্বরগণ দল বেঁধে ভাদুরির চর সভা স্থলে গিয়ে উপস্থিত হলেন। ভাদুরিরচরের মওলানা শামসুল হক ও মওলানা সিদ্দিক আহমদ দু'ভাই হিন্দুস্থান থেকে লেখাপড়া করে এসেছিলেন। তারা দু'ভাই-ই প্রভাবশালী আলিম ছিলেন।
বিকাল থেকে সভা অনুষ্ঠিত হলো। সভার জনসাধারণের মনের মধ্যে জোস ও সাড়া জাগানোর জন্য মওলানা দরবেশ আহমদ একটি কবিতা রচনা করে একজন যুবককে তা মুখস্থ করিয়ে আবৃত্তি করা শিখিয়ে ছিলেন। কুরআন তেলাওয়াতের পর সেই কবিতাটি যুবকটি সুন্দর সুর করে আবৃত্তি করলেন। কবিতাটি ছিল এই:
যেখানে যত অজ্ঞ মূর্খ লোক, যারা মরছে ধুকে ধুকে
অন্ন চাই বস্ত্র চাই ঔষধ চাই, আর
পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য চাই ন্যায্য অধিকার।
কুরআনের আলো জ্বেলে দিতে হবে তাদের বুকে বুকে। প্রাণে তাদের জাগিয়ে তুলতে হবে বাঁচার স্বপ্ন আশা নির্বাক মুখে তুলে দিতে হবে অধিকার আদায়ের ভাষা। এসেছে সুদিন, আমরা পেছনে হটবো না আর মুসলিম আমরা উঠেছি জেগে শির চির উন্নত
আল্লাহর সৃষ্টি আলো বাতাস যত সম্পদ সম্ভার
সব কিছুতেই আছে আমাদের সমান অধিকার।
হটতে হটতে পিঠ পেছনে দেয়ালে গেছে ঠেকে
নত হয়ে থাকতে থাকতে শিরদাঁড়া গেছে বেঁকে।
এবার আমরা কড়ায় গন্ডায় বুঝে নেবো অধিকার।
আল্লাহ ছাড়া এ শির কারো কাছে হবে না নত।
কবিতা আবৃত্তির পর তাঁকে একটি ইসলামী গান পরিবেশনের নির্দেশ দেয়া হলে সে গাইতে লাগলো:
জাগো মুসলমান
দিয়েছে আযান
যামানার মুয়াজ্জিন,
আর ভয় নেই ভয়
হবে হবে জয়
আল্লাহর ইসলাম দ্বীন।
ঐ যে মিনারে
হাকে বারে বারে
আল্লাহু আকবার।
আজো কেন তোর
নেই যে খবর?
হাতে ধরে হাত
ধরো এক জামাত
ওগো ও মুমিন
আর নেই ভয়
হবে হবে জয় আল্লাহ নবীর দ্বীন।
এমন কবিতা আর এমন মধুর সূর সঙ্গীত এ এলাকাবাসী কোনো দিন শোনেনি। শ্রোতারা সুরের সুরা পান করে এক অপূর্ব ভাবে মোহিত হলেন। সভায় এক অপূর্ব ভাব
গাম্ভীর্য বিরাজ করতে ছিল। এমন পরিবেশে মওলানা দরবেশ আহমদ ওঠে দাঁড়ালেন। তিনি প্রাথমিক কিছু কথা বলে এলাকাবাসীদের উদ্দেশ্য করে বললেন, প্রিয় ভাইয়েরা আমি আপনাদের কাছে এখানে এসে দেখছি, এ অঞ্চলে দুটি সম্প্রদায়ের লোক পাশাপাশি বাস করছেন। এক হিন্দু সম্প্রদায় আর এক মুসলিম সম্প্রদায়। এই দুই সম্প্রদায়ের লোকের মধ্যে আকাশ পাতাল ব্যবধান দেখছি। মুসলমানদের প্রায় সবাই ভাঙ্গা স্বাস্থ্য, পরনের কাপড় খুব নিম্ন মানের এবং ছেঁড়া ফাঁড়া ময়লাযুক্ত। সবারই ঘরবাড়ি জীর্ণ শীর্ণ ভাঙাচুড়া। লেখাপড়া জানা লোক খুব কম, উচ্চ শিক্ষিত তো নেই-ই। করো ব্যবসা বানিজ্য দোকান-পাট নেই। অল্প কিছু সংখ্যক কৃষকের ক্ষেতে ফসল ছাড়া আর কোনো রোজগারের পথ নেই। প্রায় সবাই হিন্দু মহাজনের ঋণের ভারে অবনত হয়ে থেকে মাজা বাঁকা করে বসে আছেন, এখন আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছেন না।
অন্য দিকে হিন্দু ভাইদের চেহারা স্বাস্থ্য ও পোশাক সবারই ধোপদুরস্ত, প্রায় সবাই শিক্ষিত, তারা প্রায় সবাই চাকরিজীবি এবং ব্যবসায়ী। তাদের বাড়িঘর সাজানো গোছানো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এবং সুন্দর, তাদের কেউ বেকার নেই। আচ্ছা ভাইয়েরা বলুন তো এর কারণ কি?
মওলানার কথা শুনে সবাই নীবর। কারো মুখে কোনো কথা নেই। কিছুক্ষণ নীরবতার পর মওলানা সাহেব বললেন, এর কারণ কি তা আমি জানি। আপনারা কি কারণটা জানতে চান?
এবার সবাই সমন্বরে বলে উঠলো, জী হুজুর, কারণটা জানতে চাই, বলুন। এবার মওলানা সাহেব বললেন, এর কারণ হলো একমাত্র শিক্ষা।
হিন্দুদের মধ্যে শিক্ষা আছে, আপনাদের মধ্যে শিক্ষা নেই। এ জন্য তাদের চাকরি আছে, ব্যবসা আছে, কেউ বেকার নেই। আপনাদের শিক্ষা না থাকার কারণে চাকরি নেই, ব্যবসা নেই, রোজগার নেই, ভালো পোশাক নেই, ভালো স্বাস্থ্য নেই, ভালো ঘরদোর নেই এবং প্রায় সবাই বেকার।
আমি কি ঠিক বলছি?
জী হুজুর, আপনি ঠিক বলছেন।
এখন আপনারা কি এই হীন অপমানজনক অবস্থা পরিবর্তন করতে চান?
জী চাই।
আমি যা করতে বলবো তা কি আপনারা করবেন?
জী করবো।
তা হলে আপনাদের শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে। আপনাদের ছেলে মেয়েদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। দিনের কাজের পর রাতে কিছু সময় আপনাদের লেখাপড়া করতে হবে। গ্রামে মকতব, মাদরাসা ও স্কুল গড়ে তুলতে হবে।
এ কাজে আপনারা রাজি আছেন?
জী, রাজি আছি।
ইসলামী শিক্ষার জন্য এই ভাদুরির চরে একটি মাদরাসা খুব প্রয়োজন। অলোয়া গ্রামে একটি প্রাইমারী স্কুল স্থাপন করা হয়েছে। আপনারা সবাই মিলে একটি মাদরাসা করুন। ইলম শিক্ষা করা ফরজ- আল্লাহর হুকুম। মহান আল্লাহর এই হুকুম অমান্য করার কারণে মুসলিম জাতীর বর্তমান এই দুরবস্থা। ইলম কোথায় শিক্ষা করা যাবে? মাদরাসা থেকে। তাই মাদরাসা স্থাপন করাও ফরজ। মওলানা দরবেশ আহমদের বক্তৃতায় সবাই উৎসাহী হয়ে ভাদুরির চর একটি মাদরাসা স্থাপন করলেন। এই মাদরাসার হেড ছিলেন রামপুর গ্রামের মওলানা আনার খাঁ। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল খুবই উচ্চ। তিনি যখন আযান দিতেন ভাদুরির চর, ছাব্বিশা ও বাগবাড়ি গ্রামের লোকরা সুস্পষ্ট শুনতে পেতো।
দরবেশ আহমদের ভাতিজা আহাম্মদ হাতেম আলী এই মাদরাসায় কিছুকাল শিক্ষকতা করেন। কর্ম জীবনের শুরুতে আহম্মদ হাতেম আলী ব্রিটিশ সরকারের অধীনে পুলিশ ইন্সপেক্টারের চাকরি করতেন। অসহযোগ আন্দোলনের সময় যখন দেশবাসী বিলাতী পণ্য ও ব্রিটিশ সরকারের অধীনে চাকরি ত্যাগ করা শুরু করে। তখন মওলানা দরবেশ আহমদ আসাম প্রদেশে চাকরিরত আহম্মদ হাতেম আলীকে নিজে গিয়ে চাকরি ছাড়িয়ে এনে ভাদুরির চর মাদরাসায় শিক্ষকতায় নিয়োগ করেন। এই মাদরাসার কয়েকজন কীর্তিমান ছাত্রদের মধ্যে একজন ছিলেন ডক্টর কে.টি. হোসেন ও অপর জন মৌলবী ওসমান গনি খান।
